
সূর্যের আলো আমাদের কাছে প্রতিদিনের একেবারে পরিচিত একটি বিষয়। সকাল হলে সূর্য ওঠে, আলো ছড়িয়ে পড়ে পৃথিবীতে, আর সেই আলোতেই পৃথিবীর প্রাণ ও প্রকৃতির অসংখ্য প্রক্রিয়া চলে। কিন্তু এই পরিচিত আলোর মধ্যেই এমন একটি বৈশিষ্ট্য রয়েছে, যাকে এতদিন কোয়ান্টাম প্রযুক্তির জন্য খুব একটা উপযোগী বলে মনে করা হতো না। কারণ সূর্যের আলো লেজারের মতো সুশৃঙ্খল নয়। এতে বিভিন্ন রঙের আলো থাকে এবং আলো বিভিন্ন দিকে ছড়িয়ে পড়ে। তারপরও বিজ্ঞানীরা এখন দেখিয়েছেন, এই প্রাকৃতিক এবং আপাতদৃষ্টিতে বিশৃঙ্খল আলো ব্যবহার করেও কোয়ান্টাম এন্ট্যাঙ্গলমেন্ট তৈরি করা সম্ভব।
২০২৬ সালে প্রকাশিত এক গবেষণায় কানাডার University of Ottawa এবং জার্মানির Max Planck Institute for the Science of Light এর গবেষকেরা সূর্যের আলো ব্যবহার করে সফলভাবে এন্ট্যাঙ্গলড ফোটন তৈরি করেছেন। গবেষণাটি প্রকাশিত হয়েছে Optica জার্নালে। গবেষণাপত্রটির নাম “Generating quantum entanglement from sunlight” এবং এতে Cheng Li, Jasvinder Brar, Michael Küblböck, Jeremy Upham, Hanieh Fattahi এবং Robert W. Boyd কাজ করেছেন।
কোয়ান্টাম এন্ট্যাঙ্গলমেন্ট আসলে কী?
কোয়ান্টাম এন্ট্যাঙ্গলমেন্ট এমন একটি কোয়ান্টাম সম্পর্ক, যেখানে দুটি কণার অবস্থা পরস্পরের সঙ্গে এমনভাবে যুক্ত থাকে যে তাদের আলাদা দুটি স্বাধীন ব্যবস্থা হিসেবে বর্ণনা করা যায় না। একটি কণার নির্দিষ্ট বৈশিষ্ট্য পরিমাপ করলে অন্য কণার ফলাফলের সঙ্গে এমন সম্পর্ক দেখা যায়, যা সাধারণ বা ক্লাসিক্যাল পদার্থবিদ্যা দিয়ে ব্যাখ্যা করা যায় না।
আলো নিয়ে কাজ করার ক্ষেত্রে বিজ্ঞানীরা সাধারণত দুটি ফোটনের মধ্যে এমন সম্পর্ক তৈরি করেন। বিশেষভাবে তাদের polarization বা আলোর কম্পনের দিককে এমনভাবে যুক্ত করা যায় যে দুটি ফোটন entangled অবস্থায় থাকে। এই ধরনের ফোটন ভবিষ্যতে নিরাপদ কোয়ান্টাম যোগাযোগ, অত্যন্ত সংবেদনশীল পরিমাপ এবং বিভিন্ন কোয়ান্টাম প্রযুক্তিতে ব্যবহার করা যেতে পারে।
এতদিন এই ধরনের কাজের ক্ষেত্রে লেজার ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ লেজারের আলো সাধারণ সূর্যালোকের তুলনায় অনেক বেশি coherent। অর্থাৎ লেজারের আলোক তরঙ্গের বিভিন্ন অংশের মধ্যে নির্দিষ্ট ধরনের শৃঙ্খলা থাকে। কিন্তু সূর্যের আলো স্থান ও সময়ের দিক থেকে অনেক বেশি incoherent। ফলে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠেছিল, এতটা বিশৃঙ্খল আলো দিয়ে আদৌ উচ্চমানের কোয়ান্টাম এন্ট্যাঙ্গলমেন্ট তৈরি করা সম্ভব কি না।
নতুন গবেষণাটি সেই প্রশ্নের একটি পরীক্ষামূলক উত্তর দিয়েছে। গবেষকেরা সরাসরি খালি সূর্যের আলোকে দুটি entangled photon এ পরিণত করেননি। এখানে বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ অপটিক্যাল ব্যবস্থা ব্যবহার করা হয়েছে। প্রথমে সূর্যের আলো সংগ্রহ করে সেটিকে বিশেষভাবে polarized করা হয়। এরপর একটি বড় Fresnel lens ব্যবহার করে আলোকে কেন্দ্রীভূত করা হয়।
এরপর গবেষণার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে ব্যবহার করা হয় একটি বিশেষ cone shaped all glass solar concentrator। এই যন্ত্র সূর্যের আলোকে আরও বেশি কেন্দ্রীভূত করে এমন একটি optical fiber এর মধ্যে পাঠায়, যার ব্যাস মানুষের চুলের প্রস্থের কাছাকাছি। সেখান থেকে আলোকে একটি অতি ছোট nonlinear crystal এর ওপর ফেলা হয়।
এই nonlinear crystal এর মধ্যেই ঘটে মূল কোয়ান্টাম প্রক্রিয়াটি। এর নাম Spontaneous Parametric Down Conversion বা SPDC। সাধারণভাবে এই প্রক্রিয়ায় একটি উচ্চ শক্তির photon nonlinear crystal এর সঙ্গে মিথস্ক্রিয়া করে দুটি নিম্ন শক্তির photon তৈরি করতে পারে। উপযুক্ত পরিস্থিতিতে তৈরি হওয়া এই দুটি photon এর polarization পরস্পরের সঙ্গে entangled হতে পারে।
এই গবেষণায় লেজারের পরিবর্তে সূর্যের আলোকে সেই প্রক্রিয়ার জন্য pump light হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে। অর্থাৎ সূর্যের আলো এখানে সরাসরি entangled photon নয়, বরং entangled photon তৈরির প্রক্রিয়াটিকে চালানোর আলোর উৎস হিসেবে কাজ করেছে।
সূর্যের আলো এতটা বিশৃঙ্খল হওয়া সত্ত্বেও কীভাবে সম্ভব হলো?।এখানেই গবেষণাটির বৈজ্ঞানিক গুরুত্ব সবচেয়ে বেশি।সূর্যের আলোতে অনেক wavelength বা তরঙ্গদৈর্ঘ্যের আলো রয়েছে। একই সঙ্গে সূর্যের আলো বিভিন্ন দিকে ছড়িয়ে পড়ে এবং এর spatial ও temporal coherence অনেক কম। কিন্তু গবেষকদের তাত্ত্বিক বিশ্লেষণ বলেছিল, যদি entanglement মূলত photon এর polarization এর মধ্যে তৈরি করা যায়, তাহলে সূর্যের আলোর অন্য কিছু বিশৃঙ্খলা সেই polarization entanglement কে নষ্ট করতেই হবে এমন নয়।
সহজভাবে বলা যায়, আলোর একটি বৈশিষ্ট্য বিশৃঙ্খল হলেই তার সব বৈশিষ্ট্য বিশৃঙ্খল হতে হবে এমন কোনো নিয়ম নেই। গবেষকেরা এই বিষয়টিকেই কাজে লাগিয়েছেন। সূর্যের আলো spatial ও temporal দিক থেকে অত্যন্ত incoherent হলেও তার polarization নিয়ন্ত্রণ করে তারা এমন একটি পরিস্থিতি তৈরি করেছেন যেখানে photon এর polarization এর মধ্যে শক্তিশালী quantum correlation গড়ে উঠতে পারে।
এটি কোয়ান্টাম অপটিক্সের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ ধারণাগত পরিবর্তন। কারণ দীর্ঘদিন ধরে উচ্চমানের quantum state তৈরির জন্য coherent light অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে বিবেচিত হয়ে এসেছে।
গবেষকেরা শুধু তাত্ত্বিকভাবে সম্ভাবনার কথা বলেননি। তারা বাস্তবে বাইরে সূর্যের আলো ব্যবহার করে পরীক্ষা চালিয়েছেন। উৎপন্ন photon জোড়ার quantum state পরীক্ষা করার জন্য quantum state tomography ব্যবহার করা হয়।
গবেষণায় Bell state fidelity পাওয়া গেছে 0.939 ± 0.027। সহজ ভাষায় বললে, উৎপন্ন quantum state একটি আদর্শ entangled state এর সঙ্গে প্রায় 94 শতাংশের মতো সামঞ্জস্যপূর্ণ ছিল। গবেষকেরা concurrence নামের আরেকটি পরিমাপেও 0.905 ± 0.053 মান পেয়েছেন।
আরও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো Bell’s inequality এর পরীক্ষায় Bell parameter পাওয়া গেছে 2.5408 ± 0.2171। এখানে classical physics এর সীমা হলো 2। পরীক্ষায় পাওয়া মান সেই সীমা অতিক্রম করেছে। এই ধরনের Bell inequality violation quantum entanglement এর একটি গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষামূলক প্রমাণ।
অর্থাৎ এটি শুধু এমন কোনো আলো তৈরি করা নয় যার মধ্যে সাধারণ ধরনের correlation রয়েছে। পরীক্ষার ফলাফল দেখায় যে photon জোড়ার মধ্যে প্রকৃত quantum correlation উপস্থিত ছিল।
এই গবেষণার সবচেয়ে আকর্ষণীয় সম্ভাবনাগুলোর একটি হলো মহাকাশভিত্তিক quantum technology। মহাকাশে সূর্যের আলো সহজলভ্য। তাই ভবিষ্যতে কোনো satellite যদি সূর্যের আলো সংগ্রহ করে তার সাহায্যে entangled photon তৈরি করতে পারে, তাহলে সেই satellite কে entangled photon তৈরির জন্য আলাদা শক্তিশালী laser এবং তার সঙ্গে যুক্ত কিছু সহায়ক সরঞ্জামের ওপর কম নির্ভর করতে হতে পারে।
নিরাপদ quantum communication এর ক্ষেত্রেও এর সম্ভাবনা রয়েছে। Quantum key distribution এর মতো প্রযুক্তিতে entangled photon গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে। গবেষকেরা মনে করছেন, সূর্যের আলো ব্যবহার করে quantum light source তৈরি করার এই পদ্ধতি ভবিষ্যতে resource limited পরিবেশ, Arctic অঞ্চল এবং মহাকাশভিত্তিক প্রযুক্তির জন্য বিশেষভাবে আকর্ষণীয় হতে পারে।
তবে এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ সতর্কতা রয়েছে। এই গবেষণা এখনো কোনো প্রস্তুত quantum internet বা সম্পূর্ণ কার্যকর quantum satellite তৈরি করে ফেলেনি। এটি মূলত একটি proof of principle demonstration। গবেষকেরা এখন entangled photon এর brightness এবং entanglement এর মান আরও উন্নত করার দিকে কাজ করছেন।
আরেকটি বিষয়ও মনে রাখা দরকার। সূর্যের আলো ব্যবহার করা মানেই পুরো ব্যবস্থাটি বিদ্যুৎ ছাড়া চলবে এমন নয়। পরীক্ষায় সূর্যের আলো সংগ্রহ, আলোকে সঠিকভাবে কেন্দ্রীভূত করা, সূর্যের অবস্থান অনুসরণ করা এবং photon শনাক্ত করার জন্য যথেষ্ট জটিল বৈজ্ঞানিক যন্ত্রপাতি ব্যবহার করা হয়েছে। তাই এই প্রযুক্তির বাস্তব ব্যবহারিক সুবিধা কতটা হবে, তা ভবিষ্যতের গবেষণার ওপর নির্ভর করবে।
এই গবেষণার গুরুত্ব শুধু এই কারণে নয় যে বিজ্ঞানীরা সূর্যের আলো দিয়ে entangled photon তৈরি করেছেন। এর গভীর গুরুত্ব হলো, এটি দেখিয়েছে যে quantum technology তৈরির জন্য প্রকৃতির আলোকে আমরা যতটা অগোছালো মনে করি, বাস্তবে সেটি হয়তো ততটা সীমাবদ্ধ নয়।
একসময় মনে করা হতো, quantum state তৈরির জন্য অত্যন্ত নিয়ন্ত্রিত এবং coherent আলোর উৎস দরকার। এখন দেখা যাচ্ছে, আলোর একটি অংশে শৃঙ্খলা তৈরি করে অন্য অংশে থাকা বিশৃঙ্খলা সত্ত্বেও quantum entanglement অর্জন করা সম্ভব। এর ফলে ভবিষ্যতে quantum photonics এর জন্য নতুন ধরনের আলোর উৎস নিয়ে চিন্তা করার সুযোগ তৈরি হয়েছে।
আর এখানেই সূর্যের আলোকে ঘিরে এই গবেষণার সবচেয়ে সুন্দর দিকটি রয়েছে। কোটি কোটি বছর ধরে সূর্য পৃথিবীতে আলো পাঠিয়ে আসছে। সেই আলো দিয়ে আমরা পৃথিবীকে দেখি, উদ্ভিদ খাদ্য তৈরি করে এবং পৃথিবীর জলবায়ু ব্যবস্থা চালিত হয়। এখন সেই একই প্রাকৃতিক আলোকে ব্যবহার করে বিজ্ঞানীরা এমন একটি কোয়ান্টাম সম্পর্ক তৈরি করেছেন, যা একসময় কেবল অত্যন্ত নিয়ন্ত্রিত ল্যাবরেটরি আলোর মাধ্যমে তৈরি করা সম্ভব বলে মনে করা হতো।
সূর্যের আলো থেকে কোয়ান্টাম এন্ট্যাঙ্গলমেন্ট তৈরি করার এই গবেষণা এখনো একটি প্রাথমিক পর্যায়ের বৈজ্ঞানিক প্রদর্শন। কিন্তু এর ফলাফল যথেষ্ট তাৎপর্যপূর্ণ। গবেষকেরা দেখিয়েছেন, সূর্যের মতো spatial এবং temporal দিক থেকে অত্যন্ত incoherent প্রাকৃতিক আলোও nonlinear optical process ব্যবহার করে polarization entangled photon তৈরি করতে পারে। পরীক্ষায় প্রায় 94 শতাংশ Bell state fidelity এবং classical সীমার ওপরে Bell inequality violation পাওয়া গেছে।
এর অর্থ এই নয় যে আগামীকাল থেকেই লেজারের পরিবর্তে সূর্যের আলো দিয়ে সব quantum computer চালানো যাবে। বরং এর অর্থ হলো quantum প্রযুক্তির জন্য সম্ভাব্য আলোর উৎসের তালিকাটি আরও বড় হলো। ভবিষ্যতে যদি এই প্রযুক্তির brightness, stability এবং entanglement quality আরও উন্নত করা যায়, তাহলে সূর্যের আলো মহাকাশভিত্তিক quantum communication এবং অন্যান্য শক্তি সাশ্রয়ী quantum প্রযুক্তিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
সবচেয়ে বড় কথা, গবেষণাটি আমাদের আবারও মনে করিয়ে দেয় যে প্রকৃতি সবসময় আমাদের প্রথম ধারণার মতো সরল নয়। যে সূর্যালোককে আমরা প্রতিদিনের সাধারণ আলো বলে দেখি, তার মধ্যেও এমন কোয়ান্টাম সম্ভাবনা লুকিয়ে থাকতে পারে, যা একসময় কেবল অত্যন্ত নিয়ন্ত্রিত ল্যাবরেটরির আলোর জন্যই সম্ভব বলে মনে করা হতো।
সূত্র: অপটিকা

