মহাকাশ সংবাদ

মহাবিশ্বের বৃহত্তম কাঠামোর সন্ধান

যখন আমরা খালি চোখে রাতের আকাশের দিকে তাকাই, তখন আমরা যে জ্যোতিষ্কগুলিকে দেখতে পাই, সেগুলি মূলত আমাদের নিজস্ব ছায়াপথ মিল্কি ওয়ের সদস্য কিংবা তার কিছু নিকটবর্তী প্রতিবেশী। কিন্তু এই দৃশ্যপট যেন মহাবিশ্বের এক প্রকান্ড বইয়ের মাত্র প্রথম পৃষ্ঠা। আমাদের চোখের সীমাবদ্ধতার কারণে দূরবর্তী গ্যালাক্সিগুলো এতই ম্লান যে আমরা তাদের দেখতে পাই না। যদিও তারা আসলে পুরো আকাশ জুড়ে ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে, অপেক্ষা করছে কোনো অনুসন্ধিৎসু চোখ তাদের আবিষ্কার করার।

সম্প্রতি ইউরোপীয় সাউদার্ন অবজারভেটরি বা ESA, যে বিস্তৃত-পরিসরের চিত্রটি প্রকাশ করেছে, তা আমাদেরকে সেই দূরবর্তী মহাবিশ্বের এক অসাধারণ ঝলক দেখায়। এই চিত্রটিতে হাজার হাজার দূরবর্তী গ্যালাক্সি ধরা পড়েছে, যার মধ্যে একটি বিশাল গ্যালাক্সি ক্লাস্টার Abell 315 বিশেষভাবে ফুটে উঠেছে। এটি যেন মহাবিশ্বের জনাকীর্ণ এক মহানগরীর আকাশপট, যেখানে প্রতিটি আলোকবিন্দু একটি সম্পূর্ণ ছায়াপথ, যার প্রতিটিতেই রয়েছে কোটি কোটি তারা।

চিত্রটির কেন্দ্র থেকে নীচে এবং বাম দিকে প্রসারিত প্রায় একশটি হলুদাভ গ্যালাক্সির ঘনবসতি হলো অ্যাবেল ৩১৫। এই ক্লাস্টারটি আমাদের থেকে প্রায় ২ বিলিয়ন আলোকবর্ষ দূরে, সিটাস বা তিমি মণ্ডলে অবস্থিত। দেখতে যতটাই ঘনবসতিপূর্ণ মনে হোক না কেন, এই গ্যালাক্সিগুলো হলো এই কাঠামোর তথাকথিত বরফের টুকরোর ডগা মাত্র। যেমন কোনো আইসবার্গের বিশাল অংশ পানির নিচে লুকিয়ে থাকে, তেমনি এই গ্যালাক্সিগুলোর প্রকৃত আয়তন এবং ভর আমাদের দৃষ্টির আড়ালে।

গ্যালাক্সি ক্লাস্টারগুলো মহাবিশ্বের বৃহত্তম কাঠামোগুলোর মধ্যে অন্যতম। এরা মাধ্যাকর্ষণ শক্তি দ্বারা আবদ্ধ, যেন এক বিরাট মহাজাগতিক সমবায়, যেখানে শত শত কিংবা হাজার হাজার গ্যালাক্সি পরস্পরকে টেনে ধরে রেখেছে। কিন্তু আমরা যেগুলো দেখতে পাই, তার চেয়েও বেশি কিছু আছে এদের অন্তর্নিহিত।

আর এই দানবগুলোর মোট ভরের মাত্র ১০ শতাংশ হলো দৃশ্যমান গ্যালাক্সি। আরও ১০ শতাংশ হলো গ্যালাক্সিগুলোর মধ্যবর্তী স্থানে থাকা অত্যন্ত গরম গ্যাস যা কি না এক্স-রে তরঙ্গে বিকিরণ করে, কিন্তু আমাদের চোখে অদৃশ্য। তাহলে বাকি ৮০ শতাংশ কী দিয়ে তৈরি? এটি একটি অদৃশ্য ও অজ্ঞাত উপাদান, যাকে আমরা ডার্ক ম্যাটার বা অন্ধকার পদার্থ বলে থাকি।

এই ডার্ক ম্যাটারই গ্যালাক্সিগুলোর মধ্যে বিরাজ করছে এবং পুরো ক্লাস্টারকে একসাথে ধরে রেখেছে। যদিও আমরা এটা দেখতে পাই না, কিন্তু এর অভিকর্ষজ প্রভাব অত্যন্ত শক্তিশালী। মহাবিশ্বের এই অদৃশ্য স্থপতি যেন এক নিরব নির্মাতা, যার অস্তিত্ব আমরা কেবল তার প্রভাবের মাধ্যমেই বুঝতে পারি।

এই বিশাল ভর পেছনের গ্যালাক্সি থেকে আসা আলোর পথকে বাঁকিয়ে দেয়। ঠিক যেমন একটি বিশাল বিবর্ধক কাচ কাজ করে। আইনস্টাইনের সাধারণ আপেক্ষিকতা তত্ত্ব অনুযায়ী, বিশাল ভর আলোর পথকে বক্র করে। এর ফলে পেছনের গ্যালাক্সিগুলোর আকৃতি কিছুটা বিকৃত দেখা যায়, যাকে আমরা গ্র্যাভিটেশনাল লেন্সিং বা মহাকর্ষীয় লেন্সিং বলি। এই বিকৃতি পর্যবেক্ষণ করে জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা ক্লাস্টারের মোট ভর নির্ণয় করতে পারেন।

অ্যাবেল ৩১৫-এর ক্ষেত্রে, এর মোট ভর আমাদের সূর্যের ভরের ১০০ হাজার বিলিয়ন গুণেরও বেশি! এই সংখ্যাটি এতই বিশাল যে কল্পনা করাও কঠিন। শুধু একটি গ্যালাক্সি ক্লাস্টারের ভর যদি এত বেশি হয়, তাহলে পুরো মহাবিশ্বের মোট ভর কত তা ভাবলেই বিস্মিত হতে হয়।

এই চিত্রটিতে যে গ্যালাক্সিগুলো রয়েছে, সেগুলো আমাদের থেকে ভিন্ন ভিন্ন দূরত্বে অবস্থিত। চিত্রের উপরের অংশে কিছু গ্যালাক্সির সর্পিল বাহু বা উপবৃত্তাকার বলয় স্পষ্ট দেখা যায়, যা তুলনামূলকভাবে কাছের। কিন্তু আরও দূরের গ্যালাক্সিগুলো দেখতে অনেকটা ম্লান দাগের মতো। যেন অতীতের এক ঝাপসা স্মৃতি। তাদের আলো পৃথিবীতে পৌঁছাতে ৮ বিলিয়ন বছর বা তারও বেশি সময় লেগেছে!

এর অর্থ, আমরা যখন এই চিত্রটি দেখি, আমরা আসলে সময়ের গভীরে তাকিয়ে থাকি। আমরা সেই গ্যালাক্সিগুলোকে দেখতে পাই যখন সেগুলো অনেক ছোট ছিল, যখন মহাবিশ্ব নিজেও ছিল অনেক কম বয়সী। এটা যেন এক মহাজাগতিক সময়যন্ত্র, যা আমাদের মহাবিশ্বের বিবর্তনের বিভিন্ন পর্যায় দেখার সুযোগ দেয়।

এই অসাধারণ চিত্রটি ESO-এর লাসিলা অবজারভেটরি-তে অবস্থিত MPG/ESO ২.২-মিটার টেলিস্কোপে লাগানো ওয়াইড ফিল্ড ইমেজার (WFI) ক্যামেরা দিয়ে তোলা হয়েছে। প্রায় ১ থেকে দেড় ঘণ্টা ধরে তিনটি ভিন্ন ফিল্টারের মাধ্যমে মোট একাধিক এক্সপোজার নিয়ে এই ছবিটি তৈরি করা হয়েছে। চিত্রটির আকার প্রায় পূর্ণিমার চাঁদের সমান আকাশের অংশ জুড়ে।

তবে এখানে একটি মজার ব্যাপার হলো, যদিও এই চিত্রটি পূর্ণিমার সমান আকাশ জুড়ে, কিন্তু এতে ধরা পড়েছে হাজার হাজার গ্যালাক্সি, যেখানে খালি চোখে আমরা ওই একই আকাশে মাত্র কয়েকটি তারা দেখতে পাই।

ছবি ও তথ্য কৃতিত্ব: ESA

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button