Uncategorizedপৃথিবীপ্রযুক্তিমহাকাশ

আদিম পৃথিবী ও বিশ্বাস

আমরা সহজেই যে বিষয়গুলোকে অনুমান বা বুঝতে পারি না, তাকে কট করে অযৌক্তিক, অবান্তর বা অবাস্তব বলে মনে করি। এটা অত্যন্ত স্বাভাবিক ব্যাপার। অথচ খেয়াল করলে দেখা যাবে সেই জিনিসের উপর যখন কেউ বুঝে যায় তখন তার কাছে সেটা স্বাভাবিক। পৃথিবীর বয়স মাপার জন্য আমাদের সময়ের পেছনে সেই প্রায় চারশো কোটি (তারাও বেশি) বছর আগে যাওয়া এবং জন্মের প্রত্যক্ষ করেছেন এমন কিছু বা কাউকে পাওয়া সত্যিই অসম্ভব। আর যেকারণেই বিজ্ঞানের নিখুঁত গণিত যখন এই বয়স খুঁজে আমাদের বলে তখন সেই পদ্ধতির কথা না জানার কারণে আমাদের সেটাকে অযৌক্তিক এবং হাস্যকর মনে হতে পারে। কিন্তু খেয়াল করলে দেখা যাবে দৈনন্দিন অভিজ্ঞতার সাথেই একই হিসেবকে আমরা স্বাভাবিকভাবে গ্রহণ করছি মেনেও নিচ্ছি। পার্থক্য এখানেই। আজকের প্রশ্ন ও উত্তর- পৃথিবীর বয়স কীভাবে মাপা হয়?

পৃথিবীর বয়স প্রায় ৪.৫৪ বিলিয়ন বছর। শুনতে সংখ্যাটা এত বড়ো যে আমাদের দৈনন্দিন জীবনের অভিজ্ঞতার সঙ্গে মিলিয়ে বোঝা কঠিন। কিন্তু এখানে মজার বিষয় হলো, এই বয়স শুধু কোনো অনুমান নয়। বিভিন্ন বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি একই সময়সীমার দিকে ইঙ্গিত করে।

​এর সবচেয়ে শক্তিশালী প্রমাণ আসে তেজস্ক্রিয় ক্ষয় থেকে। ধরা যাক, আপনার কাছে একটি ঘড়ি আছে, কিন্তু সেটি ঘণ্টা-মিনিট দেখায় না, ঘড়িটির ভেতরের একটি পদার্থ নির্দিষ্ট হারে অন্য পদার্থে পরিবর্তিত হয়। সেই পরিবর্তনের হার জানা থাকলে, কতক্ষণ আগে প্রক্রিয়াটি শুরু হয়েছিল তা হিসাব করা যায়। রেডিওমেট্রিক ডেটিং ঠিক এমন একটি প্রাকৃতিক ঘড়ি ব্যবহার করে।

​ইউরেনিয়াম ধীরে ধীরে সীসায় পরিণত হয়। ইউরেনিয়াম-২৩৮-এর অর্ধেক ক্ষয় হতে প্রায় ৪.৪৭ বিলিয়ন বছর লাগে। কোনো পাথরের মধ্যে ইউরেনিয়াম ও তার তৈরি সীসার পরিমাণ মাপলে বিজ্ঞানীরা হিসাব করতে পারেন পাথরটি কত পুরোনো।

​এখানে একটি বাস্তব উদাহরণ আছে। প্রাচীন জিরকন খনিজের বয়স মাপা হয়েছে প্রায় ৪.৪ বিলিয়ন বছর। জিরকন স্ফটিক তৈরির সময় ইউরেনিয়াম তার কাঠামোর মধ্যে ঢুকতে পারে, কিন্তু সীসা সাধারণত সহজে ঢোকে না। পরে ইউরেনিয়াম ক্ষয় হয়ে সীসা তৈরি করে। ফলে স্ফটিকের ভেতরে থাকা ইউরেনিয়াম-সীসার অনুপাত একটি প্রাকৃতিক ঘড়ির মতো কাজ করে।

​আরও আশ্চর্যের বিষয় হলো, শুধু পৃথিবীর পাথর দেখেই পৃথিবীর বয়স নির্ধারণ করা হয়নি। চাঁদের শিলা, পৃথিবীতে পাওয়া প্রাচীন উল্কাপিণ্ড এবং সৌরজগতের অন্যান্য প্রাচীন বস্তুতেও একই ধরনের রেডিওমেট্রিক পদ্ধতি প্রয়োগ করা হয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে তাদের বয়স প্রায় ৪.৫ বিলিয়ন বছরের কাছাকাছি পাওয়া যায়। সবচেয়ে প্রাচীন উল্কাপিণ্ডগুলোর বয়স প্রায় ৪.৫৬ বিলিয়ন বছর।

​এটা অনেকটা এমন যে একটি ঘটনার বয়স জানতে আপনি শুধু একটি ঘড়ি দেখলেন না একই ঘটনার সঙ্গে সম্পর্কিত কয়েকটি স্বাধীন ঘড়িও দেখলেন, আর সবগুলো প্রায় একই সময় দেখাচ্ছে।

​বাস্তব জীবনেও এর সহজ উদাহরণ আছে। ধরুন, একটি কাঠের টুকরোর বয়স জানতে কার্বন-১৪ পদ্ধতি ব্যবহার করা হলো। আবার একই বস্তু সম্পর্কে গাছের বলয়ও পরীক্ষা করা হলো। দুটি স্বাধীন পদ্ধতি কাছাকাছি ফল দিলে আমাদের বিশ্বাস বাড়ে। পৃথিবীর ক্ষেত্রে বিজ্ঞানীরা আরও শক্তিশালী তেজস্ক্রিয় আইসোটোপ ব্যবহার করেন, কারণ পৃথিবীর বয়স কার্বন-১৪ দিয়ে মাপার মতো বিশাল নয়, কার্বন-১৪ মূলত অপেক্ষাকৃত সাম্প্রতিক জৈব পদার্থের বয়স নির্ধারণে কার্যকর।

​আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, পৃথিবীর বয়স কোনো একটি পাথরের বয়সের সমান নয়। পৃথিবী প্রায় ৪.৫৪ বিলিয়ন বছর আগে সৌরজগতের গঠনের সময় তৈরি হয়েছিল। পৃথিবীর পৃষ্ঠের অনেক পাথর এর চেয়ে অনেক নবীন, কারণ ভূতাত্ত্বিক প্রক্রিয়ায় পুরোনো পাথর গলে যায়, ভেঙে যায় বা নতুন পাথরে রূপান্তরিত হয়।

​তাই পৃথিবীর বয়স বোঝার সবচেয়ে শক্তিশালী উপায় হলো বিভিন্ন উৎসের প্রমাণকে একসঙ্গে দেখা। পৃথিবীর প্রাচীন খনিজ, চাঁদের শিলা, উল্কাপিণ্ড এবং তেজস্ক্রিয় ক্ষয়ের নির্দিষ্ট হার, সব মিলিয়ে একই মহাজাগতিক সময়সীমার দিকে ইঙ্গিত করে।

​৪.৫৪ বিলিয়ন বছর। এটি এমন একটি বয়স, যার পেছনে রয়েছে প্রকৃতির নিজস্ব ঘড়ি, বহু প্রাচীন পাথরের রেকর্ড এবং একাধিক স্বাধীন বৈজ্ঞানিক প্রমাণ।

লিখেছেন: আল মামুন রিটন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button