
সূর্যের এত কাছে যাওয়া কি সম্ভব, যেখানে কোনো মহাকাশযান সরাসরি সূর্যের বায়ুমণ্ডলের ভেতর দিয়েই ছুটে যাবে? অবিশ্বাস্য শোনালেও মানুষ সেটিই করেছে।
২০১৮ সালের ১২ আগস্ট NASA একটি মহাকাশযান পাঠায় এমন এক জায়গায়, যেখানে যাওয়া ছিল প্রযুক্তির জন্য এক বিশাল পরীক্ষা। সূর্যের একেবারে কাছে। সেই মহাকাশযানের নাম Parker Solar Probe। এটি টেলিস্কোপ নয়; এটি একটি সৌর-অনুসন্ধানী মহাকাশযান, যার কাজ সূর্যের কাছাকাছি গিয়ে সেখানকার পরিবেশ সরাসরি পরিমাপ করা।
কিন্তু প্রশ্ন হলো, সূর্যের এত কাছে গেলে মহাকাশযানটি পুড়ে যায় না কেন? এর উত্তর আছে একটি বিশেষ তাপরোধী ঢালে। প্রায় ৪.৫ ইঞ্চি পুরু কার্বন-কম্পোজিটের এই Thermal Protection System সূর্যের দিকে মুখ করে থাকে। সূর্যমুখী অংশ প্রচণ্ড তাপ সহ্য করলেও ঢালের পেছনে থাকা বৈজ্ঞানিক যন্ত্রগুলোকে তুলনামূলকভাবে ঠান্ডা রাখে।
আর পার্কার শুধু সূর্যের দিকে এগিয়ে যায়নি, তার সাথে এটি সূর্যের বায়ুমণ্ডল, অর্থাৎ করোনা, ভেদ করে উড়েছে। ২০২১ সালে এটি ইতিহাসের প্রথম মানবনির্মিত মহাকাশযান হিসেবে সূর্যের করোনার মধ্য দিয়ে যাওয়ার কৃতিত্ব অর্জন করে। সেখানে এটি কেবল ছবি তোলেনি; চৌম্বক ক্ষেত্র, প্লাজমা এবং উচ্চশক্তির কণার মতো বিষয় সরাসরি পরিমাপ করেছে।
এর গতি আরও অবিশ্বাস্য। ২০২৫ সালের মার্চে ২৩তম সৌর-নিকটবর্তী অতিক্রমের সময় পার্কার ঘণ্টায় প্রায় ৬৯২,০০০ কিলোমিটার গতিতে চলেছিল এবং সূর্যের পৃষ্ঠ থেকে প্রায় ৬.১ মিলিয়ন কিলোমিটারের মধ্যে পৌঁছেছিল।
তবে এখানে একটি চমক আছে। সূর্যের পৃষ্ঠের তাপমাত্রা প্রায় ৫,৫০০°C হলেও তার করোনা আরও কয়েক মিলিয়ন ডিগ্রি পর্যন্ত উত্তপ্ত হতে পারে। কেন সূর্যের বাইরের বায়ুমণ্ডল তার দৃশ্যমান পৃষ্ঠের চেয়ে এত বেশি উত্তপ্ত। এটি সৌরপদার্থবিজ্ঞানের দীর্ঘদিনের অন্যতম রহস্য। পার্কার সেই রহস্যের উত্তর খুঁজছে।
আর এই গবেষণা শুধু সূর্যকে বোঝার জন্য নয়। সূর্য থেকে আসা সৌর বায়ু ও শক্তিশালী কণার প্রবাহ পৃথিবীর মহাকাশ পরিবেশ, স্যাটেলাইট, যোগাযোগব্যবস্থা এবং মহাকাশচারীদের ওপর প্রভাব ফেলতে পারে। তাই পার্কার আসলে আমাদের নক্ষত্রকে বোঝার পাশাপাশি পৃথিবীর ভবিষ্যৎ মহাকাশ-আবহাওয়াও বোঝার চেষ্টা করছে।
শেষ পর্যন্ত পার্কার সোলার প্রোবের গল্পকে এক চিন্তায় নামিয়ে আনা যায়- মানুষ সূর্যকে দূর থেকে দেখেই থেমে থাকেনি, একদিন সে তার সবচেয়ে বিপজ্জনক অঞ্চলের ভেতরেও একটি যন্ত্র পাঠিয়ে দিয়েছে, শুধু জানার জন্য যে আমাদের নক্ষত্রটি আসলে কীভাবে কাজ করে।

