দর্শন

স্বাভাবিক বিশ্বাসের ভিত্তিহীনতা – নিহিলিজম

আমরা প্রতিদিন হাজারো কাজ করি, কিন্তু খুব কম সময়ই থামি এসব কাজের মূল কারণ নিয়ে ভাবতে। পড়াশোনা করি, চাকরি করি, সম্পর্ক গড়ি, স্বপ্ন দেখি, এসবকে আমরা স্বাভাবিক ও গুরুত্বপূর্ণ বলে মেনে নেই। কিন্তু একদিন যদি কেউ দাঁড়িয়ে প্রশ্ন করে: “এসবের চূড়ান্ত অর্থ কী?” তখন আমাদের সব উত্তর যেন বাতাসে উড়ে যায়। এই জায়গাটি নিয়েই নিহিলিজমের আলোচনা।

লাতিন ”নিহিল” শব্দ থেকে নিহিলিজম, যার অর্থ ”কিছুই না”। এটি এমন একটি দার্শনিক মত যেখানে জীবনের অর্থ, নৈতিকতা ও সত্যের ভিত্তি নিয়ে গভীর সন্দেহ থাকে। তবে মনে রাখতে হবে, নিহিলিজম মানে সব কিছু অস্বীকার করা নয়, বরং এটি বিভিন্ন রূপে আসে এবং একজন মানুষ এক ক্ষেত্রে নিহিলিস্ট হতে পারেন, অন্য ক্ষেত্রে নাও হতে পারেন।

সবচেয়ে আলোচিত রূপটি হলো অস্তিত্ববাদী নিহিলিজম। এর প্রশ্ন সহজ কিন্তু জবাব কঠিন, আমাদের জীবনের কি কোনো পূর্বনির্ধারিত উদ্দেশ্য আছে? আমরা জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত এক যাত্রা পার করি, কিন্তু এই যাত্রার কোনো মহাজাগতিক পরিকল্পনা কি আছে? ধরা যাক, একজন মানুষ সারাজীবন সংগ্রাম করে সম্পদ অর্জন করলেন, পরিবার গড়লেন, সমাজে সম্মান পেলেন। তাকে আমরা সফল বলি। কিন্তু নিহিলিস্ট প্রশ্ন করবেন, সফলতা কেন গুরুত্বপূর্ণ? পরিবার কেন গুরুত্বপূর্ণ? ভালোবাসা কেন চূড়ান্ত সত্য? প্রশ্ন যত গভীরে যায়, ততই আমরা দেখি আমাদের সব মূল্যবোধ মানুষের তৈরি কাঠামোর ওপর দাঁড়িয়ে আছে।

একজন ছাত্রের উদাহরণ নেওয়া যাক। সে ভালো নম্বর পেতে চায়, কারণ ভালো বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে চায়, তারপর ভালো চাকরি পেতে চায়, টাকা পেতে চায়, সুখী হতে চায়। কিন্তু কেন সুখী হওয়া এত গুরুত্বপূর্ণ? নিহিলিজম এই প্রশ্নের সরল উত্তর দেয় না, বরং আমাদের চিন্তার ভিত্তি পরীক্ষা করতে বাধ্য করে।

নৈতিক নিহিলিজম আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক। আমরা জানি হত্যা খারাপ, প্রতারণা খারাপ, সাহায্য করা ভালো। কিন্তু এই ভালো ও মন্দ কি মানুষের চিন্তার বাইরেও বাস্তব? ধর্ম, যুক্তি, সমাজ, বিবর্তন, এসব নৈতিকতার ব্যাখ্যা দেয়, কিন্তু নিহিলিজম প্রশ্ন করে, এসব ব্যাখ্যার উর্ধ্বে কি কোনো বস্তুনিষ্ঠ নৈতিক সত্য আছে? এই প্রশ্নের জবাবে অনেকেই বলেন, নৈতিক সত্য না থাকলেও সমাজ তার নিজস্ব নিয়ম তৈরি করতে পারে। আইন, সহানুভূতি, পারস্পরিক স্বার্থ, এসব থেকেই নৈতিকতা গড়ে ওঠে।

ফ্রিডরিখ নীটশে নিহিলিজমকে একটি সাংস্কৃতিক সংকট হিসেবে দেখেছিলেন। তাঁর বিখ্যাত ঘোষণা ‘ঈশ্বর মৃত’, আক্ষরিক অর্থে নয়, বরং ঐতিহ্যগত ধর্মীয় মূল্যবোধের পতন বোঝাতে। তিনি দেখলেন, ইউরোপীয় সমাজ ধর্মের ওপর ভিত্তি করে গড়ে উঠেছিল, কিন্তু যখন সেই ভিত্তি দুর্বল হলো, তখন মানুষ নতুন কোনো ভিত্তিও তৈরি করতে পারল না। ফলে তৈরি হলো এক শূন্যতা, ‘কিছুই গুরুত্বপূর্ণ নয়’ এই অনুভূতি। নীটশে অবশ্য এখানেই থামেননি; তিনি প্রশ্ন তুললেন, মানুষ কি নিজেই নতুন মূল্যবোধ সৃষ্টি করতে পারে?

এই নিহিলিজম কিন্তু হতাশা নয়। অনেকে নিহিলিজমকে হতাশাবাদের সাথে গুলিয়ে ফেলেন। কিন্তু এরা এক নয়। হতাশাবাদী মনে করেন পৃথিবীতে দুঃখ বেশি, কিন্তু নিহিলিস্টের প্রশ্ন ভিন্ন, সুখ দুঃখের কি কোনো চূড়ান্ত অর্থ আছে? একজন মানুষ খুব আনন্দের সাথে জীবন কাটাতে পারেন, আবার একই সাথে বিশ্বাস করতে পারেন মহাবিশ্বের কোনো পূর্বপরিকল্পনা নেই। নিহিলিজম মানসিক বিষণ্ণতা নয়, এটি একটি দার্শনিক অবস্থান।

নিহিলিজমের বিপদ আছে। কেউ যদি মনে করেন সব কিছু অর্থহীন, তাহলে তিনি নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়তে পারেন। কিন্তু এখানে যুক্তিগত পার্থক্য করা জরুরি। “মহাবিশ্ব অর্থ দেয়নি” এই বক্তব্য থেকে জীবনের অর্থ নেই এমন সিদ্ধান্ত আসে না। একজন বাবা সন্তানের ভালোবাসার জন্য মহাজাগতিক অনুমোদন চান না। একজন বিজ্ঞানী জ্ঞানের জন্য গবেষণা করেন। একজন শিল্পী সৃষ্টি করেন। অর্থ মানুষের অভিজ্ঞতা থেকেই তৈরি হতে পারে।

আলবেয়ার কামু এই শূন্যতা নিয়ে ভেবেছেন গভীরভাবে। তিনি বলেছেন, মানুষ অর্থ চায়, কিন্তু মহাবিশ্ব নীরব, এই সংঘাতই অ্যাবসার্ড। কিন্তু কামু থেমে যাননি। তিনি দেখিয়েছেন, অর্থের অনুপস্থিতি স্বীকার করেও মানুষ বাঁচতে পারে, সংগ্রাম করতে পারে, নিজের অর্থ নিজেই তৈরি করতে পারে। নিহিলিজমের সামনে দুটি পথ, হয় শূন্যতায় ডুবে যাওয়া, নয়তো নতুন অর্থ নির্মাণের সাহস দেখানো।

শেষপর্যন্ত বলতে চাই যে, এই নিহিলিজম গুরুত্বপূর্ণ। কারণ এটি আমাদের চিন্তার ভিত্তি পরীক্ষা করে। এটি আমাদের শেখায় যে আমরা কেন কিছুকে গুরুত্বপূর্ণ মনে করি, কেন কোনো কাজকে সফলতা বলি, কেন নৈতিকতা মেনে চলি। এর উত্তর সবার জন্য আলাদা হতে পারে, কেউ ধর্মে খুঁজে পান, কেউ মানবতাবাদে, কেউ সম্পর্কে, কেউ সৃষ্টিশীলতায়। নিহিলিজমের সবচেয়ে বড় শিক্ষা হলো, যদি অর্থ আগে থেকে লেখা না থাকে, তাহলে আমরা নিজেরাই আমাদের জীবনের অর্থ লিখতে পারি। এই লেখার দায়িত্ব ও স্বাধীনতাই সম্ভবত আমাদের সবচেয়ে বড় মানবিক সম্পদ।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

Channel Wp
Back to top button