কোয়ান্টাম মেকানিক্স

শূন্য থেকে আজকের মহাবিশ্ব, কোয়ান্টাম মেকানিক্স কী বলে?

- আল মামুন রিটন

মনে করুন আপনি দাঁড়িয়ে আছেন এক অন্ধকার ঘরে, যেখানে ঘড়ির কাঁটা এখনও নড়েনি একবারও। সময় নেই সেখানে, স্থান নেই, এমনকি “কিছু নেই” বলে যে অবস্থাটা আমরা কল্পনা করি, সেটাও নেই। কারণ “নেই” শব্দটা বলতে গেলেও একটা প্রেক্ষাপট দরকার হয়, একটা তুলনার জায়গা দরকার হয়। অথচ ঠিক এমনই এক অবস্থা থেকে জন্ম নিয়েছিল আমাদের গোটা মহাবিশ্ব। প্রশ্নটা তাহলে দাঁড়ায় এখানে যে, শূন্য থেকে কীভাবে সব কিছু এলো? আর এই প্রশ্নের পিছু নিতে গিয়ে বিজ্ঞানীরা বারবার এসে দাঁড়িয়েছেন একটাই তত্ত্বের সামনে, যার নাম কোয়ান্টাম মেকানিক্স।

আমাদের চেনা পদার্থবিজ্ঞান শেখায় যে প্রতিটি ঘটনার একটা কারণ থাকে, একটা আগের মুহূর্ত থাকে। কিন্তু বিগ ব্যাং-এর ক্ষেত্রে ঝামেলাটা ঠিক এখানেই। যদি বিগ ব্যাং-এর “আগে” বলে কোনো সময়ই না থাকে, তাহলে তার কারণ খোঁজা যাবে কীভাবে? আইনস্টাইনের সাধারণ আপেক্ষিকতা তত্ত্ব এই জায়গায় এসে হার মেনে বসে। তত্ত্বটা অসীম ঘনত্বের একটা বিন্দুতে গিয়ে ভেঙে পড়ে, যাকে বলা হয় সিঙ্গুলারিটি। সেখানে গণিত আর কাজ করে না, উত্তর দেয় না, শুধু অসীম বলে হাত তুলে দেয়।

ঠিক এই অসহায় জায়গা থেকেই কোয়ান্টাম মেকানিক্স এগিয়ে আসে, একদম ভিন্ন এক দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে। কোয়ান্টাম জগতে কণাগুলো সবসময় নির্দিষ্ট, পূর্বনির্ধারিত নিয়মে চলে না। বরং তারা চলে সম্ভাবনার নিয়মে। একটা ইলেকট্রন একই সঙ্গে বহু জায়গায় “থাকতে পারার সম্ভাবনা” নিয়ে ঘুরে বেড়ায়, যতক্ষণ না কেউ তাকে পর্যবেক্ষণ করছে। আর এই অনিশ্চয়তার নীতিই আমাদের বলে দেয় যে শূন্যতাও আসলে ঠিক শূন্য নয়।

বিষয়টা একটু সহজ করে বলা যাক। ধরুন, আপনি একটা সম্পূর্ণ ফাঁকা, নিস্তব্ধ সমুদ্র কল্পনা করলেন, যেখানে কোনো ঢেউ নেই, কোনো নড়াচড়া নেই। কিন্তু কোয়ান্টাম পদার্থবিজ্ঞান বলছে, এমন সম্পূর্ণ শান্ত সমুদ্র বাস্তবে কখনোই সম্ভব নয়। কারণ হাইজেনবার্গের অনিশ্চয়তা নীতি অনুযায়ী শক্তি আর সময়ের মধ্যেও একটা সীমা কাজ করে। আপনি কখনোই নিশ্চিতভাবে বলতে পারবেন না যে কোনো এক মুহূর্তে শক্তি একদম শূন্য। ফলে শূন্যতা নিজেই ক্ষণে ক্ষণে ছোট ছোট শক্তির ঢেউ তৈরি করে, যাকে বলা হয় কোয়ান্টাম ফ্লাকচুয়েশন। এগুলো এতটাই ক্ষণস্থায়ী যে সাধারণত আমরা এর অস্তিত্ব টেরই পাই না।

কিন্তু আসল প্রশ্ন হলো, এই ক্ষুদ্র ফ্লাকচুয়েশন থেকে কি আস্ত একটা মহাবিশ্ব তৈরি হতে পারে? বিজ্ঞানীদের একাংশ বলছেন, হ্যাঁ, সম্ভব। যদি কোনোভাবে এমন একটা কোয়ান্টাম ফ্লাকচুয়েশন যথেষ্ট পরিমাণ শক্তি নিয়ে “স্ফীত” হয়ে ওঠে, আর নিজেকে ধ্বংস করে ফেলার আগেই বিশাল এক সম্প্রসারণের মধ্য দিয়ে যায়, তাহলে সেটাই হয়ে উঠতে পারে আমাদের মহাবিশ্বের সূচনা বিন্দু। এই ধারণাকেই বলা হয় কোয়ান্টাম কসমোলজি। পদার্থবিজ্ঞানী আলেকজান্ডার ভিলেনকিনের বিখ্যাত তত্ত্ব “শূন্য থেকে সৃষ্টি” বা creation from nothing, এই ধারণারই একটা রূপ। তার মতে মহাবিশ্ব আক্ষরিক অর্থে কোনো কারণ ছাড়াই, কোয়ান্টাম টানেলিং-এর মাধ্যমে অস্তিত্বে চলে এসেছে।

স্টিফেন হকিং এবং জেমস হার্টল একসময় প্রস্তাব দিয়েছিলেন আরেকটি অসাধারণ ধারণা, যার নাম- “নো-বাউন্ডারি প্রোপোজাল”। তাদের মতে, সময়ও শুরুর দিকে এমনভাবে বাঁকা ছিল, যেন সেটা স্থানের মতোই আচরণ করত। ফলে “সময়ের শুরু কোথায়” জিজ্ঞেস করাটা অনেকটা পৃথিবীর উত্তর মেরুর উত্তরে কী আছে জিজ্ঞেস করার মতোই অর্থহীন হয়ে যায়। কারণ সেখানে কোনো সীমানাই নেই যেখান থেকে “শুরু” বলে কিছু চিহ্নিত করা যায়।

তবে এখানেই থেমে থাকলে চলবে না। এই তত্ত্বগুলো এখনো সম্পূর্ণ প্রমাণিত নয়। কোয়ান্টাম মেকানিক্স আর আপেক্ষিকতা তত্ত্ব, এই দুটোকে একসঙ্গে মিলিয়ে একটা সম্পূর্ণ কোয়ান্টাম গ্র্যাভিটি তত্ত্ব বানানো এখনো বিজ্ঞানের অন্যতম বড় অমীমাংসিত চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। স্ট্রিং থিওরি আর লুপ কোয়ান্টাম গ্র্যাভিটির মতো প্রচেষ্টা এখনো চলমান, আর কেউ এখনো চূড়ান্তভাবে জিতে যায়নি।

তাহলে শেষ পর্যন্ত কী দাঁড়ালো? কোয়ান্টাম মেকানিক্স আমাদের কোনো নিশ্চিত উত্তর দেয় না, কিন্তু এটা আমাদের সামনে খুলে দেয় একটা অসাধারণ সম্ভাবনার দরজা। হয়তো সৃষ্টি মানে কোনো অলৌকিক ঘটনা নয়, বরং প্রকৃতির নিজস্ব নিয়মেরই এক স্বাভাবিক পরিণতি। হয়তো “কিছু না থাকা” আসলে একটা অস্থিতিশীল অবস্থা মাত্র, আর কিছু থাকাই হলো মহাবিশ্বের স্বাভাবিক গন্তব্য। আর যদি তাই হয়, তাহলে আমরা প্রত্যেকে, এই লেখা পড়ছি বলেই যে অস্তিত্ব আমাদের আছে, সেটাও আসলে সেই একই মহাজাগতিক নিয়মেরই একটা অংশ, শূন্যতার বুক থেকে জেগে ওঠা এক অনিবার্য সম্ভাবনা।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

Channel Wp
Back to top button