মহাকাশের সবচেয়ে রহস্যময় বস্তুগুলোর মধ্যে কোয়াসারের স্থান অনন্য। এগুলো দেখতে ছোট্ট একটি বিন্দুর মতো, অথচ সেই বিন্দু থেকে নির্গত শক্তি এত বেশি যে, একটি সম্পূর্ণ গ্যালাক্সির কোটি কোটি নক্ষত্র একসঙ্গে আলো ছড়ালেও তার সমান শক্তি তৈরি করতে পারে না। কোয়াসার নামটি সংক্ষিপ্ত quasi-stellar radio source থেকে এসেছে, যার অর্থ হলো তারা দেখতে নক্ষত্রের মতো কিন্তু নক্ষত্র নয়।
কোয়াসারের রহস্যের শুরু ১৯৬০-এর দশকে, যখন জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা রেডিও টেলিস্কোপ দিয়ে আকাশে কিছু অস্বাভাবিক রেডিও উৎস খুঁজে পেলেন। এগুলোর অবস্থান এতটাই ছোট মনে হচ্ছিল যে, সহজেই এগুলো নক্ষত্র বলে ভ্রম হতে পারত। কিন্তু যখন অপটিক্যাল টেলিস্কোপ দিয়ে পর্যবেক্ষণ করা হলো, তখন বোঝা গেল এদের আলোর বর্ণালি অস্বাভাবিক, যার মধ্যে এমন রেখা রয়েছে যা আগে কখনও দেখা যায়নি। ১৯৬৩ সালে জ্যোতির্বিজ্ঞানী মার্টেন শ্মিট 3C 273-এর বর্ণালি বিশ্লেষণ করে এক যুগান্তকারী আবিষ্কার করলেন: এই রেখাগুলো আসলে পরিচিত হাইড্রোজেন রেখা, কিন্তু মহাবিশ্বের প্রসারণের কারণে সেগুলো লাল দিকে সরে গেছে। অর্থাৎ এটি আমাদের খুব কাছের কোনো নক্ষত্র নয়, বরং বিপুল দূরের একটি বস্তু।
এখানেই মূল বিস্ময়। এত দূরবর্তী একটি বস্তু যদি পৃথিবী থেকে এত উজ্জ্বল দেখায়, তবে তার প্রকৃত শক্তি কত হতে পারে? পরবর্তী গবেষণায় দেখা গেল, কোয়াসার কোনো বিশেষ ধরনের তারা নয়, বরং একটি সক্রিয় গ্যালাক্সির কেন্দ্র, যেখানে একটি অতিবৃহৎ কৃষ্ণগহ্বর তার চারপাশের পদার্থকে প্রচণ্ড গতিতে আকর্ষণ করছে। কৃষ্ণগহ্বর নিজে আলো নিঃসরণ করে না, কিন্তু তার চারপাশে ঘূর্ণায়মান পদার্থের ডিস্ক—যাকে বলে অ্যাক্রিশন ডিস্ক—থেকে এত বিকিরণ বেরোয়। এই ডিস্কের পদার্থ কৃষ্ণগহ্বরে পড়ার সময় ঘর্ষণ ও মহাকর্ষীয় শক্তির কারণে প্রচণ্ড উত্তপ্ত হয় এবং বিশাল পরিমাণ শক্তি নির্গত করে।
এই শক্তির উৎস কিন্তু পারমাণবিক ফিউশন নয়। সূর্যের মতো নক্ষত্র হাইড্রোজেন ফিউশনের মাধ্যমে শক্তি উৎপন্ন করলেও কোয়াসারের ক্ষেত্রে মহাকর্ষীয় শক্তি সরাসরি বিকিরণে রূপান্তরিত হয়, যা অনেক বেশি কার্যকর। আরও বিস্ময়ের বিষয় হলো, কিছু কোয়াসার থেকে আলোর গতির কাছাকাছি বেগে জেট বা পদার্থের রশ্মি বেরিয়ে আসে, যা কয়েক মিলিয়ন আলোকবর্ষ দূর পর্যন্ত বিস্তৃত হতে পারে।
কোয়াসারের আরেকটি গভীর রহস্য সময়ের সঙ্গে জড়িত। আমরা যখন একটি দূরবর্তী কোয়াসার দেখি, তখন আমরা তার বর্তমান অবস্থা দেখি না; আমরা দেখি মহাবিশ্বের বহু বিলিয়ন বছর আগের অতীত। কারণ সেখান থেকে আলো পৃথিবীতে আসতে বিশাল সময় লাগে। তাই কোয়াসার আসলে মহাবিশ্বের ইতিহাসের জানালা। জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা দেখেছেন, প্রারম্ভিক মহাবিশ্বে কোয়াসার ছিল অনেক বেশি সক্রিয়। মহাবিশ্বের যখন বয়স মাত্র কয়েক বিলিয়ন বছর, তখন প্রচুর উজ্জ্বল কোয়াসার দেখা গেছে। অর্থাৎ সেই সময়ে অনেক গ্যালাক্সির কেন্দ্রীয় কৃষ্ণগহ্বর প্রচণ্ড গতিতে পদার্থ গ্রাস করছিল।
কিন্তু প্রশ্ন হলো, এত বিশাল কৃষ্ণগহ্বর কীভাবে এত দ্রুত তৈরি হলো? এমন কিছু কোয়াসার পাওয়া গেছে যাদের আলো আসতে ১৩ বিলিয়ন বছরেরও বেশি সময় লেগেছে, অর্থাৎ মহাবিশ্ব যখন অত্যন্ত তরুণ, তখনই কিছু কৃষ্ণগহ্বর সূর্যের চেয়ে কয়েক কোটি গুণ বেশি ভারী হয়ে গিয়েছিল। কীভাবে? নক্ষত্রের মৃত্যু? সরাসরি গ্যাসের পতন? নাকি কৃষ্ণগহ্বরের সংঘর্ষ? এই প্রশ্ন আজও জ্যোতির্বিজ্ঞানের সবচেয়ে বড় ধাঁধাগুলোর একটি।
কোয়াসার শুধু নিজেদের জন্যই নয়, তাদের আশপাশের গ্যালাক্সির বিবর্তনেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। তাদের থেকে নির্গত শক্তি ও জেট আশেপাশের গ্যাসকে উত্তপ্ত বা বাইরে ঠেলে দিতে পারে, যা নতুন নক্ষত্র সৃষ্টিকে বাধাগ্রস্ত করে অথবা পরিবর্তিত করে।
আমাদের মিল্কিওয়ে গ্যালাক্সির কেন্দ্রেও একটি সুপারম্যাসিভ কৃষ্ণগহ্বর আছে, যার নাম Sagittarius A*। কিন্তু এটি এখন অত্যন্ত শান্ত; তাই এটি কোয়াসার নয়। কেন? কারণ কোয়াসার কোনো স্থায়ী পরিচয় নয়, বরং এটি একটি পর্যায়—যখন কৃষ্ণগহ্বর প্রচণ্ডভাবে পদার্থ খাচ্ছে, তখনই তা উজ্জ্বল কোয়াসারে পরিণত হয়। সময়ের সঙ্গে সেই পর্যায় শেষ হলে তা আবার শান্ত হয়ে যায়।
আকাশের সেই ক্ষুদ্র আলোকবিন্দুটি আসলে একটি গ্যালাক্সির প্রাণকেন্দ্র, যেখানে লুকিয়ে আছে কয়েক কোটি সূর্যের সমান ভরের এক অন্ধকার দৈত্য। আর তার চারপাশের ঘূর্ণায়মান পদার্থের জ্বলন্ত ডিস্ক থেকে আসা আলো আমাদের দেখায় মহাবিশ্বের সেই সময়কে, যখন সবকিছু ছিল অনেক বেশি তীব্র, অনেক বেশি সক্রিয় এবং আরও রহস্যময়।


