মহাবিশ্ব

দুই মহা শক্তির টানাটানি, কে জিতবে এবং কী হবে?

মনে করুন, আপনি দাঁড়িয়ে আছেন এক অসীম মরুভূমির মাঝখানে। চারদিকে শুধু শূন্যতা। কোনো দিগন্ত নেই, কোনো শেষ নেই। হঠাৎ আপনি বুঝতে পারেন, এই মরুভূমি কেবল প্রসারিত হচ্ছে না। এটি প্রতি মুহূর্তে আরও দ্রুত গতিতে ছড়িয়ে পড়ছে। যেন কোনো অদৃশ্য হাত পেছন থেকে ঠেলে দিচ্ছে সবকিছু। গ্যালাক্সিগুলো একে অপরের থেকে দূরে সরে যাচ্ছে, আকাশ ক্রমশ ফাঁকা হয়ে আসছে। আর এই প্রসারণের গতি বাড়ছে প্রতিনিয়ত। প্রশ্ন হলো: “কে বা কী এই শক্তি? কোন অদৃশ্য শক্তি মহাবিশ্বকে এভাবে ঠেলে দিচ্ছে?”

আজ পর্যন্ত বিজ্ঞান যে উত্তর দিয়েছে, তা দুটি বিপ্লবী ধারণার মধ্যেই সীমাবদ্ধ। একটি স্থির, অন্যটি চঞ্চল। একটি চিরকাল একই থাকে, অন্যটি সময়ের সাথে বদলে যায়। আর এই দুই অদৃশ্য প্রতিদ্বন্দ্বীর লড়াইয়েই লেখা হচ্ছে মহাবিশ্বের শেষ অধ্যায়।

প্রথম যোদ্ধা হলো কসমোলজিক্যাল কনস্ট্যান্ট। সংক্ষেপে আমরা একে বলি ল্যামডা। একশো নয় বছর আগে, এক হাজার নয়শো সতেরো সালে, আলবার্ট আইনস্টাইন তাঁর সাধারণ আপেক্ষিকতার সমীকরণে এটি যোগ করেন। কেন? কারণ তখনকার বিজ্ঞানীরা বিশ্বাস করতেন মহাবিশ্ব স্থির। না বড় হচ্ছে, না ছোট হচ্ছে। কিন্তু আইনস্টাইনের সমীকরণ বলছিল মহাকর্ষ সবকিছুকে টানবে, মহাবিশ্ব একসময় ভেঙে পড়বে। তাই তিনি এক অদৃশ্য প্রতিরোধক শক্তি যোগ করেন। এক ধরনের মহাজাগতিক স্প্রিং, যা মহাকর্ষকে ঠেকিয়ে মহাবিশ্বকে স্থিতিশীল রাখবে।

কিন্তু কয়েক বছর পর এডউইন হাবল প্রমাণ করলেন—মহাবিশ্ব স্থির নয়। এটি প্রসারিত হচ্ছে। গ্যালাক্সিগুলো একে অপরের থেকে দূরে সরে যাচ্ছে। আইনস্টাইন তখন ল্যামডাকে তাঁর জীবনের সবচেয়ে বড় ভুল বলে আখ্যা দেন। তিনি ভেবেছিলেন এই ধারণাটাই ভুল ছিল। কিন্তু ইতিহাসের মজা হলো—সেই ভুলই আজ ডার্ক এনার্জির সবচেয়ে শক্তিশালী ব্যাখ্যা হয়ে উঠেছে।

ল্যামডা হলো ভ্যাকুয়ামের অন্তর্নিহিত শক্তি। মহাশূন্যের প্রতিটি বিন্দুতে সমানভাবে বিদ্যমান এক ধরনের শক্তি। এটি ধ্রুব। অপরিবর্তনীয়। চিরকাল একই। মহাবিশ্ব যতই প্রসারিত হোক, এই শক্তির ঘনত্ব কখনো কমে না। যেন মহাবিশ্বের প্রতিটি ঘন সেন্টিমিটারে একই পরিমাণ শক্তি লুকিয়ে আছে। সহজ, সুন্দর, গাণিতিকভাবে নিখুঁত। কিন্তু এর উৎপত্তি নিয়ে পদার্থবিদ্যা আজও উদ্বিগ্ন। কেন এই শক্তির মান এত অবিশ্বাস্যভাবে কম? কোয়ান্টাম ফিল্ড থিওরি যে মান দেয়, তার সাথে পর্যবেক্ষণের মানের পার্থক্য কোটি কোটি গুণ। একে বিজ্ঞানীরা বলেন ভ্যাকুয়াম ক্যাটাস্ট্রফি। এক নিখুঁত ধাঁধা।

এখন আসে দ্বিতীয় যোদ্ধা। কুইন্টেসেন্স। অথবা ডাইনামিক এনার্জি ফিল্ড। এটি ল্যামডার মতো ধ্রুব নয়। সময়ের সাথে সাথে এর শক্তি ও আচরণ বদলায়। এক অদৃশ্য স্কেলার ফিল্ড, যা মহাবিশ্বের বয়সের সাথে সাথে নিজেকে পরিবর্তন করে। কখনো এটি মহাকর্ষের বিরুদ্ধে জোরালোভাবে দাঁড়ায়, কখনো দুর্বল হয়ে পড়ে। যদি ল্যামডা হয় চিরস্থায়ী এক রাজা, যার রাজত্ব কখনো বদলায় না, তবে কুইন্টেসেন্স হলো উচ্ছল এক বিদ্রোহী। যে কোনো মুহূর্তে তার মন বদলাতে পারে। এই ধারণায় মহাবিশ্বের ভবিষ্যৎ আর পূর্বনির্ধারিত নয়। এটি নির্ভর করছে এই অদৃশ্য ফিল্ডের গতিপ্রকৃতির ওপর।

কিন্তু আসল প্রশ্ন হলো—এই দুইয়ের লড়াইয়ের ফল কী?

যদি ল্যামডা জিতে যায়, তাহলে মহাবিশ্ব চিরতরে ত্বরাণ্বিতভাবে প্রসারিত হতে থাকবে। গ্যালাক্সিগুলো একে অপরের থেকে দূরে সরে যাবে। প্রথমে আমাদের লোকাল গ্রুপের বাইরের গ্যালাক্সিগুলো অদৃশ্য হয়ে যাবে। তারপর আরও দূরের গ্যালাক্সি ক্লাস্টার। আকাশ ক্রমশ অন্ধকার হয়ে আসবে। একসময় নক্ষত্রগুলো জ্বালানি শেষ করে নিভে যাবে। কালো গর্তগুলো ধীরে ধীরে বাষ্পীভূত হবে। শেষ পর্যন্ত আমরা পৌঁছাব হিট ডেথ-এ। এক নিস্তব্ধ, শীতল, কালো মহাবিশ্ব। যেখানে আর কোনো নক্ষত্র জ্বলে না, কোনো গ্রহ ঘোরে না, কোনো জীবন নেই। কেবল এক চিরস্থায়ী নীরবতা। তাপমাত্রা পরম শূন্যের কাছাকাছি। সময়ের কোনো অর্থ নেই। এক অনন্ত অন্ধকার।

কিন্তু যদি কুইন্টেসেন্স জেতে, তাহলে সম্ভাবনা আরও নাটকীয়। যদি এই ফিল্ডের শক্তি সময়ের সাথে বাড়তে থাকে, তাহলে একদিন তা এতটাই প্রবল হবে যে মহাকর্ষকে পরাজিত করে শুধু গ্যালাক্সিই নয়, তারা, গ্রহ, এমনকি পরমাণু পর্যন্ত ছিন্নভিন্ন করে দেবে। বিজ্ঞানীরা একে বলেন বিগ রিপ। মহাবিশ্বের শেষ মুহূর্তে প্রতিটি কণা একে অপর থেকে আলাদা হয়ে যাবে। মহাকাশের ফ্যাব্রিক পর্যন্ত ছিঁড়ে যেতে পারে। সময়ের হিসাবে হয়তো কয়েক বিলিয়ন বছর পর, অথবা আরও আগে। কেউ জানে না।

আবার যদি ফিল্ডটি সময়ের সাথে দুর্বল হয়, তাহলে প্রসারণ ধীর হয়ে যেতে পারে। মহাকর্ষ আবার জয়ী হতে পারে। মহাবিশ্ব আবারও সংকুচিত হতে শুরু করবে। গ্যালাক্সিগুলো একে অপরের দিকে ছুটবে। তাপমাত্রা বাড়তে থাকবে। শেষ পর্যন্ত সবকিছু এক বিন্দুতে ফিরে যাবে। বিগ ক্রাঞ্চ। মহাবিস্ফোরণের উল্টো পথ। কিছু তত্ত্ব বলে, সেখান থেকে আবার নতুন মহাবিস্ফোরণ শুরু হতে পারে। এক চক্রাকার মহাবিশ্ব। জন্ম, প্রসারণ, সংকোচন, আবার জন্ম।

এখন ভাবুন। আমরা কোন পথে যাচ্ছি? ল্যামডার স্থির রাজত্বে, নাকি কুইন্টেসেন্সের অনিশ্চিত ঝড়ে?

বিজ্ঞানীরা এখন এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজছেন আধুনিকতম যন্ত্রপাতি দিয়ে। জেমস ওয়েব স্পেস টেলিস্কোপ মহাবিশ্বের প্রাচীন আলো দেখছে। ইউক্লিড মিশন গ্যালাক্সির বিতরণ মাপছে। সুপারনোভার উজ্জ্বলতা থেকে প্রসারণের হার নির্ণয় করা হচ্ছে। মহাজাগতিক মাইক্রোওয়েভ পটভূমির ছোটখাটো তারতম্য বিশ্লেষণ করা হচ্ছে। প্রতিটি নতুন তথ্য হয় ল্যামডার পক্ষে যায়, নয়তো কুইন্টেসেন্সের ইঙ্গিত দেয়।

সাম্প্রতিক কিছু পর্যবেক্ষণ ইঙ্গিত দিচ্ছে যে ডার্ক এনার্জি হয়তো পুরোপুরি ধ্রুব নয়। এটি সময়ের সাথে সামান্য পরিবর্তিত হতে পারে। যদি সত্যিই তাই হয়, তাহলে ল্যামডার সরল ছবি ভেঙে পড়বে। কুইন্টেসেন্স বা আরও জটিল কোনো ফিল্ডের দিকে আমাদের তাকাতে হবে। কিন্তু এখনও নিশ্চিত কিছু বলা যায় না। তথ্যের অনিশ্চয়তা এখনও বড়।

কিন্তু আসল প্রশ্ন হলো—এই দুই শক্তির মধ্যে পার্থক্য আমরা কখন নিশ্চিতভাবে জানতে পারব?

হয়তো আগামী এক দশকে। হয়তো দুই দশকে। নতুন প্রজন্মের টেলিস্কোপ, আরও সংবেদনশীল ডিটেক্টর, আরও সূক্ষ্ম পরিমাপ—সব মিলে হয়তো উত্তর এসে যাবে। ততদিন পর্যন্ত আমরা কেবল অনুমান করতে পারি। কল্পনা করতে পারি মহাবিশ্বের শেষ নাটকের সম্ভাব্য পর্দা।

একদিকে হিট ডেথের নীরবতা। অনন্ত অন্ধকার। কোনো শব্দ নেই, কোনো আলো নেই, কোনো পরিবর্তন নেই। অন্যদিকে বিগ রিপের চূড়ান্ত বিদ্রোহ। সবকিছু ছিন্নভিন্ন। মহাকাশের ফ্যাব্রিক ছিঁড়ে যাওয়া। অথবা বিগ ক্রাঞ্চের চূড়ান্ত সংকোচন। সবকিছু এক বিন্দুতে ফিরে যাওয়া।

এই লড়াই শুধু বিজ্ঞানের নয়। এটি এক গভীর দার্শনিক প্রশ্নও। মহাবিশ্ব কি চিরাচরিত? এক ধ্রুব শক্তির অধীনে চিরকাল একই নিয়মে চলছে? নাকি চঞ্চল? সময়ের সাথে বদলে যাওয়া এক জীবন্ত ব্যবস্থা? আমরা কি এক স্থির নাটকের দর্শক, নাকি এক পরিবর্তনশীল গল্পের চরিত্র?

যতক্ষণ না জানা যাচ্ছে, ততক্ষণ এই অনিশ্চয়তাই আমাদের সবচেয়ে বড় সঙ্গী। দুই অদৃশ্য প্রতিদ্বন্দ্বী লড়ছে নীরবে। একটি ধ্রুবকের স্থিরতায়। অন্যটি পরিবর্তনের ঝড়ে। আর আমরা—এই ক্ষুদ্র গ্রহের বাসিন্দারা—সেই লড়াই দেখার জন্য আমাদের দুরবীন তাকিয়ে রেখেছি অজানার দিকে। যেখানে মহাবিশ্বের ইতিহাসের শেষ অধ্যায় এখনও লেখা হচ্ছে।

হয়তো একদিন আমরা জানতে পারব কোন পথ সত্যি। হয়তো জানতে পারব না। কিন্তু যতদিন দেখব, ততদিন এই প্রশ্ন আমাদের মনে ঘুরপাক খাবে। মহাবিশ্ব কি শেষ পর্যন্ত নীরবতায় হারিয়ে যাবে? নাকি এক বিস্ফোরণে ছিন্নভিন্ন হয়ে যাবে? নাকি আবার ফিরে যাবে শুরুর বিন্দুতে?

উত্তর লুকিয়ে আছে সেই অদৃশ্য শক্তির লড়াইয়ের ফলাফলে। আর সেই লড়াই দেখার জন্য আমাদের একমাত্র জানালা হলো বিজ্ঞান। সেই দুরবীন, যা এখনও তাকিয়ে আছে অন্ধকারের দিকে। যেখানে দুই প্রতিদ্বন্দ্বী লড়ছে মহাবিশ্বের ভাগ্য লেখার জন্য।

লিখেছেন:
আল মামুন রিটন
সম্পাদক, বিজ্ঞান তথ্য

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

Channel Wp
Back to top button