বিজ্ঞান রহস্য

আমরা মাত্র ছয় ধাপ দূরে – মজার থিওরি

আপনি বাংলাদেশের এক সাধারণ মানুষ। ঢাকার কোনো গলি বা গ্রামের কোনো বাড়িতে বসে আছেন। আর হাজার হাজার মাইল দূরে হলিউডের কোনো বিখ্যাত অভিনেতা বা অভিনেত্রী। আপনার সাথে তাঁর কোনো পরিচয় নেই। কোনো চিঠি লেখা হয়নি, কোনো ফোন নম্বর নেই, কোনো সাধারণ বন্ধুও নেই। তবুও যদি কেউ বলে: আপনি আর সেই তারকা মাত্র কয়েকজন মানুষের মাধ্যমে যুক্ত হতে পারেন—তাহলে কি আপনার বিশ্বাস হয়?

এই অবিশ্বাস্য ধারণাটির নামই Six Degrees of Separation। বাংলায় আমরা বলি ছয় ধাপের বিচ্ছিন্নতা। মানে পৃথিবীর যেকোনো দুজন মানুষের মধ্যে গড়ে মাত্র ছয়জন মানুষের একটি শিকল থাকতে পারে। একজন চেনে আরেকজনকে, সে চেনে তৃতীয়জনকে। আর ঠিক এভাবেই মাত্র ছয় ধাপেই পৌঁছে যাওয়া যায়।

গল্পটা শুরু হয়েছিল অনেক আগে। ১৯২৯ সালে হাঙ্গেরির একজন লেখক ফ্রিগিয়েস কারিন্থি একটা ছোট গল্প লিখেছিলেন। নাম “চেইনস” বা শিকল। তিনি কল্পনা করেছিলেন পৃথিবীর যেকোনো দুজন মানুষকে যদি আপনি বেছে নেন, তাহলে মাত্র পাঁচ বা ছয়জন পরিচিত মানুষের মাধ্যমে তাঁদের যোগাযোগ করা সম্ভব। সেই সময় এটা শুধু গল্পের কথা ছিল। কেউ বিশ্বাস করেনি যে এটা বাস্তবেও ঘটতে পারে।

তারপর প্রায় চল্লিশ বছর পরে একজন সমাজবিজ্ঞানী বিষয়টা পরীক্ষা করে দেখার সিদ্ধান্ত নিলেন। নাম স্ট্যানলি মিলগ্রাম। ১৯৬৭ সালে তিনি আমেরিকায় একটা বিখ্যাত পরীক্ষা চালালেন। নাম দিলেন Small World Experiment। তিনি কয়েকশ মানুষকে চিঠি দিলেন। চিঠিতে লেখা ছিল “এই প্যাকেটটা একজন নির্দিষ্ট মানুষের কাছে পৌঁছে দিতে হবে। কিন্তু সরাসরি পাঠানো যাবে না। শুধুমাত্র আপনার পরিচিত কোনো মানুষের হাতে দিতে হবে, যিনি হয়তো টার্গেট ব্যক্তির একটু কাছাকাছি থাকতে পারেন। সেই মানুষ আবার তাঁর পরিচিত কাউকে দেবেন। এভাবে চলতে থাকবে।”

ফলাফল দেখে সবাই অবাক। গড়ে মাত্র পাঁচ থেকে ছয় ধাপেই প্যাকেটগুলো গন্তব্যে পৌঁছে গিয়েছিল। দূরের অপরিচিত মানুষও যেন হঠাৎ কাছের হয়ে উঠল।

এখন প্রশ্ন হলো— “এটা কীভাবে সম্ভব? পৃথিবীতে আজ প্রায় আটশো কোটি মানুষ। এত মানুষের মধ্যে দূরত্ব এত কম কীভাবে?”

ধারণাটা সহজ। ধরুন আপনি প্রায় একশ থেকে দেড়শ মানুষকে চেনেন। আপনার পরিচিত প্রত্যেক ব্যক্তিও আবার একশ বা দেড়শ মানুষকে চেনেন। হিসাবটা যদি সরলভাবে করা যায়, তাহলে দুই ধাপেই আপনার নেটওয়ার্ক লাখো মানুষে পৌঁছে যায়। তিন ধাপে কোটি কোটি। কিন্তু বাস্তবে এত সরল নয়। কারণ একই মানুষ বারবার আসে। আপনার বন্ধুর বন্ধু হয়তো আপনারও বন্ধু। তবুও নেটওয়ার্ক এত দ্রুত বাড়ে যে কয়েক ধাপের মধ্যেই পুরো পৃথিবী ছোট হয়ে আসে।

বিজ্ঞানীরা পরে আরও গভীরে গেছেন। তাঁরা দেখেছেন মানুষের সামাজিক নেটওয়ার্কের একটা বিশেষ গুণ আছে। কিছু মানুষ আছেন যাঁদের পরিচিতি অনেক বেশি তাঁদের বলা হয় হাব। আর মানুষের বন্ধুত্বের মধ্যে ক্লাস্টারিং থাকে। অর্থাৎ আপনার বন্ধুরা নিজেদের মধ্যেও বন্ধু হয়। এই দুই জিনিস মিলেই তৈরি হয় “ছোট পৃথিবী”।

তবে একটা কথা মনে রাখতে হবে। “পৃথিবীর সবাই ঠিক ছয় ধাপ দূরে” এটা কোনো কঠোর বৈজ্ঞানিক নিয়ম নয়। এটা একটা গড় হিসাব। সময়, জায়গা, যোগাযোগের মাধ্যম বদলালে সংখ্যাটাও বদলায়। পুরনো দিনে চিঠির যুগে হয়তো ছয় বা সাত হতো। আজকের যুগে?

আজকের যুগে ইন্টারনেট আর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম সবকিছু বদলে দিয়েছে। ফেসবুক, হোয়াটসঅ্যাপ, ইনস্টাগ্রাম এসব জায়গায় মানুষের সংযোগ অনেক বেশি ঘন। কয়েক বছর আগে মাইক্রোসফট আর ফেসবুকের গবেষকরা বিশাল ডেটা নিয়ে হিসাব করেছিলেন। তাঁরা দেখেছেন গড় দূরত্ব এখন প্রায় চার থেকে পাঁচ ধাপের মধ্যে নেমে এসেছে। অর্থাৎ ছয় ধাপের সেই পুরনো ধারণা এখন আরও ছোট হয়ে গেছে।

মজার ব্যাপার হলো, এই ছোট পৃথিবীর ধারণা শুধু মানুষের বন্ধুত্বেই সীমাবদ্ধ নয়। বিজ্ঞানীরা গণিতবিদদের মধ্যে “এর্দোশ নাম্বার” হিসাব করেন। একজন বিখ্যাত গণিতবিদ পল এর্দোশের সাথে কত ধাপে গবেষণাপত্র লেখা হয়েছে। অভিনেতাদের মধ্যে কেভিন বেকন গেম আছে। দেখা যায় প্রায় সব অভিনেতাই কেভিন বেকনের সাথে কয়েক ধাপে যুক্ত।

এই ধারণার গুরুত্ব শুধু মজার খেলার মধ্যেই নেই। মহামারী ছড়ানো, খবর ছড়ানো, এমনকি নতুন ধারণা ছড়িয়ে পড়ার গতি এই ছোট পৃথিবীর কারণে অনেক দ্রুত হয়। একজন মানুষের মুখ থেকে আরেকজনের কানে খবর যায়, আর কয়েক ধাপের মধ্যেই তা হাজার হাজার মানুষের কাছে পৌঁছে যায়।

তাই যখন আপনি শুনবেন— পৃথিবী অনেক বড়, মানুষ অনেক অপরিচিত— তখন একটু থেমে ভাবুন।

হয়তো আপনি এমন একজনকে চেনেন, যিনি এমন একজনকে চেনেন, যিনি আবার এমন কাউকে চেনেন। আর কয়েকটা ধাপ পরেই সেই মানুষটি দাঁড়িয়ে আছেন, যাকে আপনি ভাবতেও পারেননি যে তিনি আপনার পরিচিত পৃথিবীর এত কাছে।

পৃথিবী বিশাল। সমুদ্র, পাহাড়, মহাদেশ—সবকিছুই বিশাল। কিন্তু মানুষে মানুষে সেই দূরত্বটা হয়তো ততটা বিশাল নয়। সম্পর্কের অদৃশ্য জাল আমাদের সবাইকে একসঙ্গে বেঁধে রেখেছে। আর সেই জালের রহস্যই হলো— Six Degrees of Separation

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Channel Wp
Back to top button