স্বাস্থ্য

আমাদের মস্তিষ্কের প্রিয় খাদ্য হলো অভিনবত্ব

“আমাদের মস্তিষ্ক একটি গতিশীল, পরিবর্তনশীল অঙ্গ” এই ধারণা আধুনিক স্নায়ুবিজ্ঞানের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ আবিষ্কার। বিংশ শতাব্দীর শেষভাগ পর্যন্ত মনে করা হতো, প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের মস্তিষ্কের গঠন প্রায় স্থির এবং নতুন দক্ষতা শেখার ক্ষমতা বয়সের সঙ্গে হ্রাস পায়। কিন্তু Neuroplasticity গবেষণা সেই ধারণা সম্পূর্ণ বদলে দিয়েছে। আজ কিন্তু আমরা জানি, প্রতিদিনের অভিজ্ঞতা, বিশেষ করে নতুন কিছু শেখা বা করার অভ্যাস, আমাদের মস্তিষ্কের স্নায়ুসংযোগ পুনর্গঠন করতে পারে এবং আমাদের অজানা সামর্থ্যের দ্বার খুলে দিতে পারে।

এই নিবন্ধে আমরা বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিকোণ থেকে বিশ্লেষণ করব কেন নিয়মিত কাজের পাশাপাশি প্রতিদিন একটি নতুন কাজ করার অভ্যাস আমাদের শারীরিক, মানসিক ও স্নায়ুগত বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

নিউরোপ্লাস্টিসিটি বলতে বোঝায় আমাদের মস্তিষ্কের সেই ক্ষমতা, যার মাধ্যমে এটি নতুন অভিজ্ঞতা, শেখা, আঘাত বা পরিবেশগত পরিবর্তনের প্রতিক্রিয়ায় নিজের স্নায়ুপথ পুনর্বিন্যাস করতে পারে। দুটি প্রধান প্রক্রিয়ায় এটি ঘটে:

১. সিনাপটিক প্লাস্টিসিটি: স্নায়ুকোষের মধ্যকার সংযোগস্থল বা সিন্যাপসের শক্তি বৃদ্ধি বা হ্রাস। নতুন কিছু শেখার সময় নতুন সিন্যাপস তৈরি হয়, পুরোনো সিন্যাপসের কার্যকারিতা বাড়ে।

২. স্ট্রাকচারাল প্লাস্টিসিটি: দীর্ঘমেয়াদি নতুন অভিজ্ঞতার ফলে মস্তিষ্কের নির্দিষ্ট অঞ্চলের ধূসর পদার্থ বা gray matter-এর ঘনত্ব বা আয়তন পরিবর্তিত হতে পারে। উদাহরণস্বরূপ, লন্ডনের ট্যাক্সি চালকদের হিপোক্যাম্পাস অঞ্চল, যা স্থানিক স্মৃতি ও নেভিগেশনের জন্য দায়ী। গবেষণায় দেখা গেছে এটা সাধারণ মানুষের তুলনায় বড়ো।

এই আবিষ্কারগুলোর মূল বার্তাই হলো- মস্তিষ্ক কোনো স্থির যন্ত্র নয়, বরং একটি পেশির মতো অঙ্গ, যা ব্যবহারের মাধ্যমে বিকশিত হয়।

নিয়মিত কাজ বা রুটিন আমাদের মস্তিষ্কের জন্য শক্তি সাশ্রয়ী। পরিচিত কাজের জন্য মস্তিষ্ক “অটোপাইলট” মোডে চলে যায়, যাকে স্নায়ুবিজ্ঞানীরা বলেন স্বয়ংক্রিয়তা। এতে শক্তি খরচ কম হয় এবং দক্ষতা বজায় থাকে। কিন্তু সমস্যা হলো, যখন কোনো কাজ সম্পূর্ণ স্বয়ংক্রিয় হয়ে যায়, তখন মস্তিষ্কের সেই কাজে জড়িত অঞ্চলগুলোর সক্রিয়তা কমে যায় এবং নতুন স্নায়ুসংযোগ তৈরি হওয়ার সুযোগ হ্রাস পায়।

অন্যদিকে, নতুন কাজ করার সময় মস্তিষ্ককে “সমস্যা সমাধান” মোডে প্রবেশ করতে হয়। এটি প্রিফ্রন্টাল কর্টেক্স, হিপোক্যাম্পাস এবং বেসাল গ্যাংলিয়ার মতো অঞ্চলগুলোকে সক্রিয় করে। নতুন উদ্দীপনার মুখোমুখি হলে মস্তিষ্কে ডোপামিন নিঃসরণ হয়, যা শেখার আগ্রহ, মনোযোগ এবং স্মৃতি গঠনে সহায়তা করে। গবেষণায় দেখা গেছে, ডোপামিন স্নায়ুসংযোগের দীর্ঘমেয়াদি শক্তিবৃদ্ধিকে ত্বরান্বিত করে, যা নতুন দক্ষতা শেখার মৌলিক প্রক্রিয়া।

প্রতিদিন একটি নতুন কাজ করার বৈজ্ঞানিক উপকারিতার অন্যতমগুলো হলো- নতুন অভিজ্ঞতা মস্তিষ্কে কগনিটিভ রিজার্ভ তৈরি করে, অর্থাৎ মস্তিষ্কের সমস্যা সমাধানের বিকল্প পথ তৈরি করার ক্ষমতা। এই রিজার্ভ বেশি থাকলে বয়সজনিত স্নায়ুক্ষয় (যেমন আলঝেইমার রোগ) শুরু হলেও লক্ষণ প্রকাশ পেতে দেরি হয়। দৈনিক নতুন কাজ করা রিজার্ভ তৈরির একটি সক্রিয় পদ্ধতি।

আমরা যখন অপরিচিত কিছু করি যেমন নতুন রান্নার রেসিপি চেষ্টা, ভিন্ন রাস্তায় হাঁটা, নতুন ভাষার শব্দ শেখা বা অচেনা কোনো যন্ত্র বোঝার চেষ্টা, তখন মস্তিষ্কের ডিফল্ট মোড নেটওয়ার্ক এবং এক্সিকিউটিভ কন্ট্রোল নেটওয়ার্কের মধ্যে নতুন সংযোগ তৈরি হয়। এই সংযোগ সৃজনশীল চিন্তা, উদ্ভাবন এবং অভিনব সমাধান খুঁজে পাওয়ার ভিত্তি।

মনোবিজ্ঞানের “সেলফ-ডিটারমিনেশন থিওরি” অনুসারে, মানুষ তখনই সবচেয়ে বেশি শেখে, যখন সে সামান্য চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হয় সেটা সবসময় খুব সহজও নয়, আবার অসম্ভবও নয়। এই অবস্থাকে বলা হয় ফ্লো চ্যানেল বা অনুকূল চ্যালেঞ্জ অঞ্চল। প্রতিদিন একটি নতুন কাজ করার অভ্যাস ঠিক এই অঞ্চলেই মস্তিষ্ককে রাখে, যা প্রেষণা বা motivation ও আত্মকার্যকারিতার অনুভূতি বাড়ায়।

এই বিষয়ে বিভিন্ন গবেষণায় দেখা যায়, মানুষ প্রায়শই নিজের দক্ষতার সীমানা সম্পর্কে ভুল ধারণা পোষণ করে, বিশেষত, “আমি এটা পারব না” এই পূর্বধারণা মস্তিষ্কের সম্ভাবনাকে সীমিত করে। নতুন কাজ করার মাধ্যমে কেউ আবিষ্কার করতে পারেন যে, তিনি ছবি আঁকায় দক্ষ, অথবা জটিল যন্ত্র বোঝার অসাধারণ ক্ষমতা রাখেন, কিংবা অপরিচিত মানুষের সঙ্গে যোগাযোগে প্রাকৃতিক দক্ষতা আছে, যা আগে কখনো জানতেন না। স্নায়ুবিজ্ঞানের ভাষায়, এটি সুপ্ত নিউরাল সার্কিটের সক্রিয়তা।

এখন প্রশ্ন, কীভাবে শুরু করবেন?

ক্ষুদ্র পরিসরে শুরু করুন: প্রতিদিন ১৫–২০ মিনিটের একটি নতুন কাজ যেমন বাঁ হাতে দাঁত ব্রাশ করা, নতুন একটি শব্দ শেখা, অথবা ভিন্ন ধাঁচের গান শোনা। ছোট পরিবর্তনও মস্তিষ্কের প্লাস্টিসিটি উদ্দীপিত করে।

বৈচিত্র্য আনুন: একই ধরনের নতুন কাজ নয়; একদিন শারীরিক দক্ষতা (নাচ, যোগব্যায়াম), আরেক দিন মানসিক দক্ষতা (ধাঁধা, নতুন ভাষা), আরেক দিন সামাজিক দক্ষতা (অপরিচিত কারও সঙ্গে কথা বলা)। এতে মস্তিষ্কের ভিন্ন ভিন্ন অঞ্চল সক্রিয় হয়।

ভুল করতে ভয় পাবেন না: নতুন কিছু শেখার সময় ভুল মস্তিষ্কের জন্য অপরিহার্য সংকেত। গবেষণায় দেখা গেছে, ভুলের পর মস্তিষ্কের এরর-রিলেটেড নেগেটিভিটি (ERN) নামে একটি বৈদ্যুতিক সংকেত তৈরি হয়, যা শেখার প্রক্রিয়াকে ত্বরান্বিত করে।

রুটিনের সঙ্গে সংযুক্ত করুন: প্রতিদিন একটি নির্দিষ্ট সময়ে নতুন কাজটি করুন। উদাহরণস্বরূপ, সকালের চায়ের পর নতুন একটি কবিতার লাইন মুখস্থ করা। এতে অভ্যাস গঠনের স্নায়ুপথ শক্তিশালী হয়।

বিজ্ঞান এখন প্রমাণ করেছে, মানুষের মস্তিষ্ক জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত নতুন কিছু শেখার এবং নিজেকে পুনর্গঠনের ক্ষমতা রাখে। দৈনন্দিন রুটিনের স্বাচ্ছন্দ্য আমাদের জীবনে স্থিতিশীলতা আনে, কিন্তু সেখানে একটি নতুন কাজের স্পর্শ যোগ করলে আমরা কেবল আরও দক্ষ হয়ে উঠি না, এর সাথে নিজের ভেতরে থাকা অজানা সম্ভাবনার দরজাও খুলে দিই। স্নায়ুবিজ্ঞানী ড. মার্ক রাইখেলের ভাষায়, “মস্তিষ্কের প্রিয় খাদ্য হলো অভিনবত্ব।”

সুতরাং, আগামীকাল সকালে উঠে নিজেকে প্রশ্ন করুন: “আজ আমি কী নতুন কাজ করব?” আর এই প্রশ্নটিই হতে পারে আপনার মস্তিষ্কের সবচেয়ে বড়ো উপহার।

লিখেছেন:
আল মামুন রিটন
সম্পাদক, বিজ্ঞান তথ্য

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Channel Wp
Back to top button