আমি যখন সকালে ঘুম থেকে উঠি, কখনো কখনো মনে পড়ে যায় গতকাল সকালে কার সঙ্গে কথা বলেছিলাম। আবার কখনো ভাবি, দুপুরে কী খেয়েছিলাম, সেটাও মাথায় থাকে না। তবে মজার ব্যাপার হচ্ছে, পুরোনো একটা গান শুনলেই হঠাৎ করে মন চলে যায় অনেক বছর আগের এক বিকেলে। যেন সময়টা একটু থমকে দাঁড়ায়, আর আমার চারপাশের সব কিছু তখনকার মতো হয়ে যায়।
কিন্তু আসলে আমাদের মাথার ভেতরে কী ঘটে তখন? ব্যাপারটা কিন্তু কম্পিউটারের ফোল্ডারের মতো না, যেখানে একটা ফাইল রেখে দিলাম, আর খুঁজলে সেটা পেয়ে যাব। আমাদের স্মৃতি কিন্তু সেভাবে তৈরি হয় না। যখন কোনো কিছু দেখি, শুনি, কিংবা কোনো অনুভূতি হয়, তখন আমাদের মস্তিষ্কের নানা প্রান্ত একসঙ্গে কাজ শুরু করে দেয়। স্নায়ুকোষগুলোর মধ্যে নতুন যোগাযোগ তৈরি হয়, আর সেটাই মনে হয় স্মৃতি। অনেকটা মস্তিষ্কের ভেতর নতুন একটা পথ বেরিয়ে যাওয়ার মতো।
আমার প্রথম সমুদ্র দেখার কথা মনে পড়ে। বাতাসে নোনতা গন্ধ, ঢেউয়ের শব্দ, চোখের সামনে পানি যতদূর দেখা যায়—সবকিছু মিলেই এমন একটা অভিজ্ঞতা ছিল যা শুধু সমুদ্র শব্দটার মধ্যে ধরা দেয় না। তার সঙ্গে আছে অনুভূতি, আবহাওয়া, তখনকার মেজাজ— সব কিছু।
এই কারণেই হয়তো সামান্য কোনো গন্ধ, বা কোনো একটা গান শুনে হঠাৎ পুরোনো কোনো দিন ফিরে আসে। এমনকি একটা নির্দিষ্ট জায়গাও আমাদের নিয়ে যেতে পারে অনেক দূরে।
আমাদের মাথার ভেতর হিপোক্যাম্পাস নামে একটা অংশ আছে। এটি নতুন কোনো ঘটনা বা অভিজ্ঞতাকে দীর্ঘমেয়াদি স্মৃতিতে পরিণত করতে খুব সাহায্য করে। যেমন, আজকে আমি কার সঙ্গে দেখা করলাম, বা গত শুক্রবার বিকেলে কী করছিলাম— এগুলো মনে রাখতে এই অংশটা খুব অ্যাকটিভ থাকে।
সবচেয়ে মজার কথা হচ্ছে, স্মৃতি কিন্তু স্থির থাকে না। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এটি মস্তিষ্কের বিভিন্ন অংশের সঙ্গে নতুন সম্পর্ক তৈরি করে। তাই যখন আমি কোনো পুরোনো ঘটনা ভাবি, তখন মাথার একাধিক জায়গা একসঙ্গে কাজ শুরু করে। শুধু একটা জায়গা থেকে সেটা তুলে আনা হয় না।
আরও একটা ব্যাপার আছে, যা আমার কাছে খুব কৌতূহলের। স্মৃতি মনে করার মানে কিন্তু সেটাকে আবার ঠিক যেমন ছিল সেভাবে দেখা না। প্রতিবার মনে করার সময় সেটা একটু বদলে যায়। তার সঙ্গে নতুন ভাবনা, বর্তমান অনুভূতি সব মিলে যায়। তাই ছোটবেলার একটা ঘটনা আমি যেভাবে মনে রাখি, আমার বোন হয়তো সেটা একটু অন্যরকম মনে রাখে। আর সেটা সময়ের সঙ্গে আরও বদলায়। কিছু অংশ উজ্জ্বল থাকে, কিছু মুছে যায়, আর মস্তিষ্ক নিজে নিজে ফাঁকা জায়গাগুলো পূরণ করে ফেলে।
তাহলে কী আমাদের স্মৃতি পুরোপুরি সত্যি? আমি মনে করি না। আমরা সাধারণত ভাবি স্মৃতি মানে অতীতের কোনো চলচ্চিত্রের দৃশ্য। কিন্তু আসলে তা না। স্মৃতি আরও অনেকটা গল্প বলার মতো। যখনই কোনো ঘটনা ভাবি, মস্তিষ্ক তখন পুরোনো জানা তথ্য, বর্তমান মেজাজ, আর অনুভূতি মিলিয়ে সেটাকে নতুন করে তৈরি করে।
এ কারণেই আবেগপূর্ণ কোনো ঘটনা সহজে ভোলা যায় না। প্রথম ভালোবাসা, বা খুব কাছের কাউকে হারানোর দিন, কোনো কঠিন অর্জন এই সব স্মৃতি মনে থাকে অনেক বেশি শক্ত করে। কারণ আবেগের সঙ্গে যুক্ত মস্তিষ্কের অংশগুলো তখন খুব সক্রিয় থাকে। অ্যামিগডালা নামের অংশটা নির্ধারণ করে কোনো ঘটনা আমাদের কাছে কতটা গুরুত্বপূর্ণ। যদি সেটা আবেগে ভরা হয়, তবে তা সংরক্ষিত হওয়ার সম্ভাবনা অনেক বেশি।
কিন্তু শুধু দেখলেই বা শুনলেই যে স্মৃতি হয়ে যাবে, তা কিন্তু না। মনোযোগ দেওয়া খুব জরুরি। আমি প্রতিদিন যে রাস্তা দিয়ে অফিসে যাই, সেই রাস্তায় কটা দোকান, বা কোন বিল্ডিংয়ের রং কী তা কি আমার মনে থাকে? না, তা থাকে না। কারণ মস্তিষ্ক সব বিষয় সমান গুরুত্ব দেয় না। যেটার দিকে আমি মন দিই, সেটাই আমার স্মৃতিতে জায়গা পায়।
আর ঘুম? ওহ, ঘুম কিন্তু অতটা নিষ্ক্রিয় সময় না। আমি যখন ঘুমাই, মস্তিষ্ক কিন্তু অফিসের মতো কাজ চালিয়ে যায়। দিনের বেলায় যা যা দেখেছি, শুনেছি, শিখেছি সবগুলোকে সাজানো হয়, কোনটা কোথায় রাখলে ভালো হয়, সেটা ঠিক হয়। তাই পরীক্ষার আগের রাতে যদি না ঘুমিয়ে পড়াশোনা করি, তাহলে অনেক সময় সেটা কাজে দেয় না। বরং একটু ঘুমিয়ে নিলে মস্তিষ্ক সেই তথ্য গুছিয়ে রাখতে পারে।
ছোটবেলায় বন্ধুর মোবাইল নম্বর একবার শুনে মনে রাখতে পারতাম না। কিন্তু যখন কয়েকবার ডায়াল করলাম, তখন সেটা আপনা-আপনি মাথায় বসে গেল। কারণ বারবার ব্যবহার করায় স্নায়ুবিক সংযোগগুলো শক্ত হয়। স্মৃতিও তেমনই বেশি ব্যবহার করি, তত বেশি টেক্কা হয়।
আমার কাছে সবচেয়ে আশ্চর্যের বিষয় হলো, আমরা শুধু শিখি না, শেখার সময় আমাদের মস্তিষ্কও বদলে যায়। স্নায়ুকোষগুলোর মধ্যে যোগাযোগের ধরন পাল্টায়। নতুন পথ তৈরি হয়, পুরোনোগুলো শক্ত হয়। আর এই বদলই আমাদের শেখার ভিত্তি।
ভুলে যাওয়াটা কিন্তু খারাপ কিছু না। যদি জীবনের প্রতিটি ছোট ঘটনা, প্রতিটি মুখ, প্রতিটি শব্দ ঠিকঠাক মনে থাকত, তাহলে কত বিশৃঙ্খল হয়ে যেত সব! তখন গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো আলাদা করাও দায় হয়ে যেত। তাই ভুলে যাওয়া মস্তিষ্কের একটা ফিল্টারের কাজ করে, যাতে সত্যিই দরকারি জিনিসগুলো আলাদা হয়ে থাকে।
আমি যখন পুরোনো কোনো ছবি দেখি, হঠাৎ এক সময়ের কথা মনে পড়ে যায়, যে ঘটনার কথা হয়তো অনেক বছর ভুলেই ছিলাম। একটা গান শুনে বুকের ভেতর কেমন একটা অনুভূতি তৈরি হয়। নাকের কাছে আসা একটা নির্দিষ্ট গন্ধ যেন আমাকে নিয়ে যায় বহু বছর আগের কোনো বিকেলে।
মনে হয় স্মৃতি আসলে কোনোদিন হারায় না। শুধু মস্তিষ্কের ভেতর তাদের পথটা আমরা সবসময় পাই না। আর সবচেয়ে বড়ো বিষয় হলো আমি প্রতিদিন নতুন নতুন স্মৃতি তৈরি করছি, কিন্তু এই পুরো প্রক্রিয়াটা কীভাবে এত নিখুঁতভাবে ঘটে, তার সবকিছু আমরা এখনো জানি না।
হ্যাঁ, আমরা জানি হিপোক্যাম্পাস কাজ করে, স্নায়ুকোষের সম্পর্ক বদলায়, ঘুম আর মনোযোগ গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু ঠিক কীভাবে একটা ছোট গন্ধ বা শব্দ বহু বছর পর আমাদের নিয়ে যায় কোনো নির্দিষ্ট সময়ে এটা এখনো পুরোপুরি বোঝা যায়নি। স্মৃতি কোনো বাক্সে রাখা জিনিস না। বরং মস্তিষ্কের অসংখ্য সংযোগের একটা বিশাল জাল, যেখানে জড়িয়ে আছে আমাদের দেখা, শোনা, ভালোবাসা, হারানো আর অনুভব করা সব কিছু। সেই জালই হয়তো আমাদের অতীতকে ধরে রাখে। সুতরাং প্রশ্ন শুধু “মস্তিষ্ক কীভাবে স্মৃতি জমা করে?” —তা না। এখানে বড়ো অদ্ভুত প্রশ্ন হলো, স্মৃতি যদি এতটুকু বদলাতেই থাকে, তবে আমি যে অতীতকে নিজের বলে মনে করি, সেটা আসলে কতটুকু সত্যি?